Sunday, April 22, 2012

“হ্যাঁ রে, পটল কত করে?”


আর সকলের মত আমারও স্কুল জীবনের স্মৃতি বড়ই মধুর। জীবনে অনেক কিছুই স্কুল থেকে শিখেছি, অনেক বড় মাপের ব্যাক্তিত্বদের সান্নিধ্যে এসেছি, তাদের স্নেহ পেয়েছি, প্রয়োজনে তিরস্কৃতও হয়েছি। কিন্তু আজ যে মানুষটির স্মৃতিচারণ করব, এনার সাথে স্কুলের কোনও সুখস্মৃতি নেই। শুধু আমার কেন, আশা করি আমার কোনও সহপাঠীরও ছিল না, থাকা সম্ভব নয়। ওনার আসল নামটা এখানে গোপন রাখলাম; নামের উচ্চারনের সাথে মিল রেখে ওনাকে “আর্তনাদ বাবু” বলেই ডাকি। ওনাকে কোনদিনই ভুলব না; নবম এবং দশম শ্রেণীতে অতিরিক্ত বিষয় পদার্থবিদ্যা পড়াতে গিয়ে উনি আমাদের যেরূপ অপদার্থ হিসেবে পেয়েছিলেন, তারই কিছু টুকরো স্মৃতি এখানে তুলে ধরছি।

     আর্তনাদ বাবুর কথা বলার একটি বিশেষ পদ্ধতি ছিল, সেটি পদার্থবিদ্যার কোন নিয়ম মেনে চলে আমি আজ অব্দি আবিষ্কার করতে পারি নি। ওনার কথা বলা শুরু হত “হ্যাঁ রে” উচ্চারনের সাথে এবং এটি বলার সময় উনি একটি বিশেষ উপায়ে ওনার অঙ্গুলিটি আমাদের দিকে তাক করে দিতেন। আমার বাল্যবন্ধু দিবাকর প্রতিদিন ওনার ক্লাসে কথা বলত, এর ওর সাথে ফসটামি- নষ্টামি করত। প্রতিদিন আর্তনাদ বাবু ওকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “হ্যাঁ রে, কোথা থেকে আসা হয়?”। দিবাকর প্রতিদিন বলত, “স্যার, সোদপুর।“। স্যার বলতেন, “আর আসতে হবে না।“ [দিবাকর এখন সুখী সংসারী লোক। ওর স্ত্রীয়ের মত সুন্দরী মহিলা আমি কমই দেখেছি। ভাগ্যবান]।

     এই প্রতিদিনের নাটক আরও জমে উঠত, যদি কেউ বলত, “স্যার, একটু বাথরুম যাব।“। আর্তনাদ অমায়িকভাবে বলত, “বাথরুম যাবি? তো যা”। ছেলেটি সামনের দরজা দিয়ে বাথরুমের জন্য বেরিয়ে যখন দ্বিতীয় দরজা অতিক্রম করত করিডর দিয়ে, স্যার ক্লাস থেকে ডাক দিতেন, “হ্যাঁ রে, শোন”। ছেলেটি করিডর থেকে বলত, “কি স্যার?”। আর্তনাদ বলত, “হ্যাঁ রে, ওখানেই কানটি ধরে বসে পর।“ কিছু বলার নেই।

     নবম শ্রেণীর প্রথম সারির ছাত্রদের পদার্থবিদ্যার একটি প্রবলেম করাতে গিয়ে উনি একদিন একটু মানে ইয়ে, নিজেই প্রবলেম এ পড়ে গেছিলেন। ছেলেগুলোও ছিলাম আমরা বাজে ভাষায় যাকে বলে ,”গাছ হারামি।” চিত্তরঞ্জন দাসগুপ্তর পদার্থবিদ্যার বই মাধ্যমিক স্তরের জন্য যথেষ্ট কিন্তু আর্তনাদকে একটু ঘোরানোর জন্য উচ্চমাধ্যমিক স্তরের হ্যালিডে বা ভারমার বই থেকে প্রবলেম বেছে বেছে আনতাম। তো, অনেক ভেবে, বোর্ডের ওপর অনেক ছবি এঁকেও যখন আর্তনাদ প্রবলেমটি করতে পারলেন না, আমাকে বললেন যে দশম শ্রেণীর ফাস্ট বয়কে ডেকে আনতে। আমিও গেলুম, দাদাকে বললুম কেসটি কি। দাদা এলে, আর্তনাদ তাকে বলল, “হ্যাঁ রে, দেখি প্রবলেম টা করতে পারিস নাকি!”। দাদা একটু সময় নিয়ে বোর্ডে প্রবলেমটি সঠিকভাবে করে চলে গেল। এরপর আর্তনাদ একটি কথাই বলেছিল, “হ্যাঁ রে” না বলে, “দেখ, একেই বলে ফাস্ট বয়।”

     কথায় বলে, “যেমন বাপ, তার তেমন ছেলে।“ কথাটি আর্তনাদ আর ওঁর আজব দুনিয়ার বেধপ ছেলের ক্ষেত্রে ১০০% খাঁটি ছিল। অদ্ভুত ছেলে। আমাদের থেকে এক শ্রেণী নীচে পড়ত। যে রাগ আমরা ছাত্ররা ওর বাবার ওপর ফলাতে পারতাম না, তা স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের মাঠে ওর ওপর ঝাড়তাম। কারন অকারনে ল্যাঙ, ঘুষি চলতেই থাকত। একদিন ছেলেটিকে আমাদের সহপাঠী রাহুল বেশ ভালো কেলিয়েছে যাকে বলে, ফুটবল খেলার সময়। সে বেচারা, আর না পেরে টিচারস( তখন মানে অন্য ছিল, এখন উচ্চারন করলে আরেক জিনিস দেখি) রুমে ওর বাবার কাছে নালিশ করতে গেছে। আর্তনাদ বেরিয়ে এলেন, দেখলেন ছেলে কাঁদছে, ওকে জিজ্ঞেস করলেন বারবার, “হ্যাঁ রে, কি হয়েছে? কি হয়েছে?”। কিন্তু ছেলের তো হয়ে গেছে, ছেলে আর নালিশ করবে কি! রুম থেকে একটু দূরে রাহুল দাঁড়িয়ে আর্তনাদের ছেলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে দৃষ্টিশক্তি দিয়েই হূল ফোটাতে থাকল শুধু। আর নালিশ করতে পারল না বেচারা। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় নাকি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আর্তনাদের ছেলে (আরও উঁচু স্তরের বৈজ্ঞানিক, বাবাকেও ছাড়িয়ে গেছে) বাড়িতে বিছানার চাদরে আগুন লাগিয়ে বলেছিল, “বাবা, বাবা, দেখ হাইড্রোজেন জ্বলছে!”। আর্তনাদ তখন “হ্যাঁ রে” বলে কি উত্তর দিয়েছিলেন, জানা নেই।

     এই “হ্যাঁ রে” এর কবল থেকে শুনেছি বাজারের সবজিওয়ালারাও বাদ যায়নি। উনি সবজির দোকানে গিয়েও বলতেন , “হ্যাঁ রে, পটল কত করে?” কয়েকবছর আগে উনি স্কুলের বিজ্ঞানবিভাগের প্রধান হয়ে অবসর নিয়েছেন। আশা করি, স্কুলে এখন সব শান্ত আছে, আর ছেলেদের প্রস্রাব চেপে করিডরে কান ধরে বসতে হয় না।