না না, কোনও বাঘ নিয়ে এই লেখা নয়। বরং যাকে
নিয়ে এই লেখা, নাড়ু, আমার স্কুলের বন্ধু, সে নিতান্তই চুপ চাপ ছেলে ছিল স্কুলে।
তবে কলেজের গণ্ডী পেরানোর আগেই নাড়ুর অনেক
উন্নতি ঘটেছিল, গুরুজনেরা যাকে বলেন লেজ গজানো বা পিছন পেকে যাওয়া। আমার, আগে
থেকেই পাকা ছিল। বন্ধুর ভালো নামটি বললাম না। সবেমাত্র দুই সপ্তাহ আগে বিয়ে করেছে।
যা লিখতে চলেছি, তা যদি ওর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী দেখে, সামনের মাসে তালাক দিয়ে দিতে
পারে।
তখন ব্যাচেলর্স ডিগ্রী পেরিয়ে মাস্টার্সে
ঢুকেছি সবে। নাড়ু তখনও ডাক্তারি পড়ছে। নাড়ুর বাড়িটি ছিল আদর্শ মদ খাওয়ার ঠেক, সপ্তাহের
মধ্যে যদি কলেজ না যেতে হত। অনেক সময় আমরা প্ল্যান করে দু’জনেই কলেজ বাঙ্ক করে ওর বাড়িতে
বসে মদ্যপান করতাম। নাড়ুর মা ছিলেন একটি স্কুলের হেড মিস্ট্রেস আর ওর বাবাও অফিসে
বেরিয়ে যেতেন অনেক সকালে। সকাল ১০ টায় নাড়ুর মা স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেই নাড়ু
চলে যেত মদ কিনতে। আমিও বাড়ি থেকে রওনা দিতাম। আর আমাদের মদ খাওয়ার পাট বিকেল ৪
টের মধ্যে শেষ করতে হত কারন তার পরেই কাকিমা স্কুল থেকে ফিরতেন। তখন মদ বলতে
সবচেয়ে সস্তা হুইস্কি। কোনও কোনোদিন এরকমও হয়েছে, আমরা সবে মদ্যপান করে নাড়ুর বাড়ি
থেকে বেরচ্ছি আর কাকিমাও তখন ঢুকছেন। কাকিমা হেসে জিগ্যেস করছেন, “কেমন আছ?” আর
আমিও ঢুলুঢুলু চোখে বেশী বেসামাল হওয়ার আগেই কাকিমার পায়ে পড়ে প্রনাম করতাম। আর
নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের ঠেক ছিল গঙ্গার ঘাট।
এরকমই একদিন, নাড়ুর বাড়িতে মদ্যপান করতে করতে,
সে বেচারা মুখ ফুটে বলেই ফেলল যে সদ্য প্রেমে পড়েছে। আলোচনা এমন জায়গায় গিয়ে
দাঁড়ালো যে বোতল শেষ হতে হতে নাড়ু ঠিক করেই নিল, আমাকে সেদিনই ওর সেই হবু শ্বশুরবাড়ি
দেখাবে আর ওই অবস্থাতেই দেখাবে। আমিও উস্কে দিয়ে বললাম, “চল, শালা।“ নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে, স্টেশনে এসে, লোকাল ট্রেনে
বিনা টিকিটে দুটি স্টেশন পেরিয়ে এলাম নাড়ুর হবু শ্বশুরবাড়ি দেখতে। ট্রেন থেকে নেমে হাঁটছি তো হাঁটছিই। ওই লোকালয়টি
আমার খুব পরিচিত ছিল না, কিন্তু স্কুল জীবন থেকে বন্ধুদের বিশেষ আলোচনায় অংশগ্রহণ
করে জেনেছিলাম যে ওর কাছাকাছি একটি বেশ্যাপল্লী আছে। আমি বিষয়টি নিয়ে নাড়ুকে
জিগ্যেসও করলাম কিন্তু নাড়ু “লা লা ( না না, মাতাল অবস্থার উচ্চারণ) “ বলে কাটিয়ে
দিল। প্রায় এক ঘণ্টা ওই অবস্থায় ঘোরার পরও
নিজের হবু শ্বশুরবাড়ি না পেয়ে, তিতিবিরক্ত হয়ে, নাড়ু বলল, “চল, ফিরে যাই।“ আমি তো
মনে মনে হাসছিও আবার এরকম হাঁটানোর জন্য ওকে উদুম খিস্তিও মারছি।
নাড়ু পথিকৃৎ, শর্ট রাস্তায় স্টেশন নিয়ে যাবে;
চল। একটা রাস্তা থেকে এক গলির ভেতর দিয়ে চলা শুরু করলাম। গলির সামনে দেখি দেশী
মদের ঠেক, লোকজন ছোলা সেদ্দ দিয়ে টানছে। নাড়ু আমার থেকে প্রায় দশ হাত আগে হাঁটছে।
গলির দুই দিকে ছোটো ছোটো খুপরির মত টালির বাড়ি। সন্ধ্যে ঘনিয়ে গেছে, হালকা বাল্বের
আলোয় রাস্তায় সব বুঝতে পারছি না, তার ওপর টেনে রয়েছি। সামনে, হঠাৎ হালকা আলোতে
দেখতে পেলাম, নাড়ুর ওপর দুই দিক থেকে দুই জন বয়স্কা মহিলা ঝাঁপিয়ে পড়ে বলছে, “ এই,
এদিকে এসো না গো”, “আচ্ছা বল, কত?”, এই সব উক্তি। মুহূর্তের মধ্যে বুঝলাম, ভুল
জায়গায় ঢুকে পড়েছি; নেশা সব এক নিমেসে শেষ। কে নাড়ু? আমি তো ঘুরে দৌড়; জীবনে এত
জোরে কোনোদিন ছুটিনি। অনেকটা দূর আসার পর লোকজনকে জিগ্যেস করে করে স্টেশন এ
পৌঁছাই। আমার পরে পরে নাড়ুও হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে উপস্থিত। আমি কোনও জীবিকা বা
কাউকে ছোটো করছি না কিন্তু আমাদের জীবনে বেশ্যাগৃহের সামনে পৌঁছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা
প্রথমবার ছিল। যথারীতি, ক্যাবলা বাঙালী ছেলেদের একটু বুক ধুরপুর তো করেই।
এরপর অনেক বছর কেটে গেছে।
শেষ মাসে, নাড়ুর ফোন। বলল, বিয়ে করছে, যেন
অবশই আসি। জিগ্যেস করলাম,” তোর শ্বশুরবাড়ি কোথায়?” যে জায়গাটি বলল, সেখানেই আমরা
দুই মাতাল প্রায় ছয় বছর আগে ওর তখনকার হবু শ্বশুরবাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম।