Friday, December 21, 2012

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যে হয়



না না, কোনও বাঘ নিয়ে এই লেখা নয়। বরং যাকে নিয়ে এই লেখা, নাড়ু, আমার স্কুলের বন্ধু, সে নিতান্তই চুপ চাপ ছেলে ছিল স্কুলে। তবে কলেজের গণ্ডী পেরানোর  আগেই নাড়ুর অনেক উন্নতি ঘটেছিল, গুরুজনেরা যাকে বলেন লেজ গজানো বা পিছন পেকে যাওয়া। আমার, আগে থেকেই পাকা ছিল। বন্ধুর ভালো নামটি বললাম না। সবেমাত্র দুই সপ্তাহ আগে বিয়ে করেছে। যা লিখতে চলেছি, তা যদি ওর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী দেখে, সামনের মাসে তালাক দিয়ে দিতে পারে। 

তখন ব্যাচেলর্স ডিগ্রী পেরিয়ে মাস্টার্সে ঢুকেছি সবে। নাড়ু তখনও ডাক্তারি পড়ছে।  নাড়ুর বাড়িটি ছিল আদর্শ মদ খাওয়ার ঠেক, সপ্তাহের মধ্যে যদি কলেজ না যেতে হত। অনেক সময় আমরা প্ল্যান করে দু’জনেই কলেজ বাঙ্ক করে ওর বাড়িতে বসে মদ্যপান করতাম। নাড়ুর মা ছিলেন একটি স্কুলের হেড মিস্ট্রেস আর ওর বাবাও অফিসে বেরিয়ে যেতেন অনেক সকালে। সকাল ১০ টায় নাড়ুর মা স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেই নাড়ু চলে যেত মদ কিনতে। আমিও বাড়ি থেকে রওনা দিতাম। আর আমাদের মদ খাওয়ার পাট বিকেল ৪ টের মধ্যে শেষ করতে হত কারন তার পরেই কাকিমা স্কুল থেকে ফিরতেন। তখন মদ বলতে সবচেয়ে সস্তা হুইস্কি। কোনও কোনোদিন এরকমও হয়েছে, আমরা সবে মদ্যপান করে নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরচ্ছি আর কাকিমাও তখন ঢুকছেন। কাকিমা হেসে জিগ্যেস করছেন, “কেমন আছ?” আর আমিও ঢুলুঢুলু চোখে বেশী বেসামাল হওয়ার আগেই কাকিমার পায়ে পড়ে প্রনাম করতাম। আর নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের ঠেক ছিল গঙ্গার ঘাট।
  
এরকমই একদিন, নাড়ুর বাড়িতে মদ্যপান করতে করতে, সে বেচারা মুখ ফুটে বলেই ফেলল যে সদ্য প্রেমে পড়েছে। আলোচনা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো যে বোতল শেষ হতে হতে নাড়ু ঠিক করেই নিল, আমাকে সেদিনই ওর সেই হবু শ্বশুরবাড়ি দেখাবে আর ওই অবস্থাতেই দেখাবে। আমিও উস্কে দিয়ে বললাম, “চল, শালা।“  নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে, স্টেশনে এসে, লোকাল ট্রেনে বিনা টিকিটে দুটি স্টেশন পেরিয়ে এলাম নাড়ুর হবু শ্বশুরবাড়ি দেখতে।  ট্রেন থেকে নেমে হাঁটছি তো হাঁটছিই। ওই লোকালয়টি আমার খুব পরিচিত ছিল না, কিন্তু স্কুল জীবন থেকে বন্ধুদের বিশেষ আলোচনায় অংশগ্রহণ করে জেনেছিলাম যে ওর কাছাকাছি একটি বেশ্যাপল্লী আছে। আমি বিষয়টি নিয়ে নাড়ুকে জিগ্যেসও করলাম কিন্তু নাড়ু “লা লা ( না না, মাতাল অবস্থার উচ্চারণ) “ বলে কাটিয়ে দিল। প্রায় এক ঘণ্টা ওই অবস্থায় ঘোরার  পরও নিজের হবু শ্বশুরবাড়ি না পেয়ে, তিতিবিরক্ত হয়ে, নাড়ু বলল, “চল, ফিরে যাই।“ আমি তো মনে মনে হাসছিও আবার এরকম হাঁটানোর জন্য ওকে উদুম খিস্তিও মারছি। 

নাড়ু পথিকৃৎ, শর্ট রাস্তায় স্টেশন নিয়ে যাবে; চল। একটা রাস্তা থেকে এক গলির ভেতর দিয়ে চলা শুরু করলাম। গলির সামনে দেখি দেশী মদের ঠেক, লোকজন ছোলা সেদ্দ দিয়ে টানছে। নাড়ু আমার থেকে প্রায় দশ হাত আগে হাঁটছে। গলির দুই দিকে ছোটো ছোটো খুপরির মত টালির বাড়ি। সন্ধ্যে ঘনিয়ে গেছে, হালকা বাল্বের আলোয় রাস্তায় সব বুঝতে পারছি না, তার ওপর টেনে রয়েছি। সামনে, হঠাৎ হালকা আলোতে দেখতে পেলাম, নাড়ুর ওপর দুই দিক থেকে দুই জন বয়স্কা মহিলা ঝাঁপিয়ে পড়ে বলছে, “ এই, এদিকে এসো না গো”, “আচ্ছা বল, কত?”, এই সব উক্তি। মুহূর্তের মধ্যে বুঝলাম, ভুল জায়গায় ঢুকে পড়েছি; নেশা সব এক নিমেসে শেষ। কে নাড়ু? আমি তো ঘুরে দৌড়; জীবনে এত জোরে কোনোদিন ছুটিনি। অনেকটা দূর আসার পর লোকজনকে জিগ্যেস করে করে স্টেশন এ পৌঁছাই। আমার পরে পরে নাড়ুও হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে উপস্থিত। আমি কোনও জীবিকা বা কাউকে ছোটো করছি না কিন্তু আমাদের জীবনে বেশ্যাগৃহের সামনে পৌঁছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রথমবার ছিল। যথারীতি, ক্যাবলা বাঙালী ছেলেদের একটু বুক ধুরপুর তো করেই।

এরপর অনেক বছর কেটে গেছে।

শেষ মাসে, নাড়ুর ফোন। বলল, বিয়ে করছে, যেন অবশই আসি। জিগ্যেস করলাম,” তোর শ্বশুরবাড়ি কোথায়?” যে জায়গাটি বলল, সেখানেই আমরা দুই মাতাল প্রায় ছয় বছর আগে ওর তখনকার হবু শ্বশুরবাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম।

Friday, September 21, 2012

বোধি, শেষ দৃশ্য, আমাদের সিনেমাগুলো



আমি অতি বাজে ধরনের মাথা মোটা লোক। বই পড়ে কোনও কিছু বুঝতে আমার বেশ সময় লাগে। Algorithm এ LIFO FIFO , ভিড় বাসে চড়ার আগে কোনোদিন ঠিক ঠাক বুঝতে পারিনি। তবে কোনও জিনিস দেখে, যেমন সিনেমা বা আশে  পাশে যা হচ্ছে, আমি সহজে অনেক কিছু নিতে পারি। আমি সিনেমা নিয়ে দাঁড়ি চুলকে আঁতলামো মারা সেই সব বিদগ্ধ কোকিলাহারী ( বঙ্কিমচন্দ্রের “বাবু” ) নই। সিনেমা জিনিসটা ছোটো থেকেই খুব ভালোবাসি (অনেকটা তোতোর মত)। আর Star  Movies এর থেকে Hallmark এ সিনেমা দেখতেই বেশি পছন্দ করতাম। তবে, আমি সব দেখি, শুক্রবারের মসালা হিন্দি সিনেমা থেকে দেব, European , hollywood থেকে অনুরাগ। আর সব থেকে বেশি উপভোগ করি সিনেমা নিয়ে আড্ডা, আলোচনা; আঁতলামো নয়। আমার খুব কম সংখ্যক বন্ধু বান্ধবের মধ্যে বেশীর ভাগ লোকই ভাল সিনেমা দেখে, তা নিয়ে আলোচনা করতে ভালবাসে। আর কখনও  কোনও বাইরের লোক সেই আড্ডার মাঝে আঁতলামো মারতে এলে, আমরা অতি সাবধানে যত্ন সহকারে তার কাছা খুলে হাতে ধরিয়ে দেই। এই লেখার পরের অংশ অন্য দিকে মোড় নেবে।

শেষ রাতে, বেশ গভীর রাতেই,  এক বন্ধুর নেমন্ত্রনে এক রেস্তোরায় হাজির হলাম। অনেক দিন পর দেখা। দুই বন্ধুই অতি উৎফুল্ল। একটু না হলে তো নয়। বসা হল একটু পানীয় নিয়ে। বন্ধু, সাথে তার আরেক বন্ধুকে নিয়ে এসেছে, নাম বোধি। আলাপ পরিচয় হল, কথা বার্তা শুরু হল। আমাকে দাদা বলে সম্বোধন করে কথা বলা শুরু করল, বয়সে ছোটই হবে। প্রায় দু ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, আড্ডা চলছে। আমার এই বন্ধুটির সিনেমা বিষয়ক জ্ঞান ভয়ঙ্কর, আলোচনাও করে না সেই সব নিয়ে। কথার ছলে, কোনোভাবে আড্ডায় সিনেমা চলে আসে, আর তা নিয়ে নিজ দায়িত্বে কথা বলা শুরু করে স্বয়ং বোধি। বোধির সিনেমার বিষয়ে অগাধ জ্ঞান দেখে আমি চমকে যাই, অত্যন্ত খুশিও হই। আর কিছু European সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে করতে, আমরা শেষে ঈশ্বরে চলে যাই। হ্যাঁ, অবশ্যই এই বিশাল range এর আলোচনার জন্য পেটের পানীয়ও অনেকটা দায়ী।

বোধিকে জিজ্ঞেস করলাম, ভগবানে বিশ্বাস নেই কেন? বোধি বলল, “ তোমাকে কয়েকটা দৃশ্য বলছি। ধরে নাও একটা সিনেমার অংশ।” আমি উৎসাহ নিয়ে শোনা শুরু করলাম।

\\\ একজন ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র, তৃতীয় বর্ষের। রোজকার মত সেদিনও সকালে মা ভাত ডাল ভাজা তাড়াতাড়ি করে রান্না করে দিয়েছেন। কোনোমতে খেয়ে সকালে ক্লাস করতে চলে গেছে।

একটা সরকারি অফিস। ছেলেটির বাবা সেখানে চাকরি করেন। রোজকার মত লাঞ্চ টাইমে ঘরে স্ত্রীকে একবার ফোন করলেন। কেউ ফোন ধরল না; দুবার, তিনবার, না, কোনও উত্তর নেই। আর দুবার চেষ্টা করে ভদ্রলোক বাড়ির দিকে রওনা হলেন তাড়াহুড়ো করে।

বেলা চারটে নাগাদ, ক্লাস শেষে ছেলেটি বন্ধুদের সাথে কলেজে আড্ডা মারছে। মোবাইলে বাবা ফোন করে খুব ধীর গলায় ছেলেকে বাড়ি চলে আসতে বললেন।

ছেলে বাড়ি এসে দেখল, মা মারা গেছেন। হঠাৎ করে, cerebral attack.  সকালেও মা সুস্থ ছিলেন।

রাতে মায়ের মরদেহ নিয়ে শ্মশানের দিকে যাত্রা করার সময় ছেলেটি দেখল, খাওয়ার টেবিলে রাতের খাবার ঢাকা দিয়ে রাখা আছে। ///

আমি বোধির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম, তারপর চোখ নামিয়ে নিলাম।

Friday, August 31, 2012

বেনফিস এ বই!


তখন ক্লাস নাইনে পড়ি, খুব সম্ভবত। স্কুলে একজন নতুন ইংরেজির শিক্ষক এলেন। অল্পবয়স্ক, বেশ জিম করা পেটানো চেহারা; উনি নাকি ক্যারাটে ব্ল্যাক বেল্ট ছিলেন; খুবই ভদ্রলোক; বেশ ভালই পড়াতেন; নাম ঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত অরূপ।  ওনার চেহারা দেখে আমরা ছাত্ররা বেশ ভয়ে ভয়ে থাকতাম, ক্লাসে কোনও গণ্ডগোল না।

তখন কোলকাতা বই মেলা সবে শেষ হয়েছে। আমি সেই বছর বইমেলায় যাইনি। একদিন ক্লাসে অরূপ স্যার পড়া শুরু করার আগে জিজ্ঞেস করলেন, কে কে এবারের বইমেলায় গেছে? ক্লাসে যা হয়, সবাই হঠাৎ করে নিজেকে পুস্তকপ্রেমী প্রমাণ করতে চায়; অনেকেই হাত তুলল। তাদের বেশীর ভাগই সেইবারের বইমেলায় যায়নি।

এই না যাওয়া কিন্তু হাত তোলা ছেলেদের দলে, একজন ছিল রুদ্র। পুরো নাম মনে নেই। আর আমার সাথে স্কুল জীবনে বেশী কথাবার্তাও হোতো না। ওর একটু কথার উচ্চারণ করতে অসুবিধা হত, যা নিয়ে ক্লাসের ছাত্ররা ওকে অনুকরণ করে মজা নিত; খুবই বাজে অভ্যাস কিন্তু একটা বয়সে স্কুল জীবনে এগুলো হয়ে থাকে; সুখ স্মৃতি হিসেবেই রয়ে যায়।

তো, রুদ্র হাত তোলায়, রুদ্রকে অরূপ স্যার দাঁড় করান, জিজ্ঞেস করেন কোন স্টল থেকে কি বই কিনেছে। রুদ্র পড়ল ফাঁপরে! পাশ থেকে একটি অত্যুৎসাহী, বন্ধুর শুভচিন্তক ছেলে ফিস ফিস করে বলে, “ বল, বেনফিস থেকে বই কিনেছি।“ রুদ্র বন্ধুর ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে স্যারের কাছে প্রকাশ করল ওর পুস্তকপ্রেম।

স্যার রীতিমত আঁতকে উঠলেন, “বেনফিস এ বই!” আমার এখনও স্যারের মুখের এক্সপ্রেশন মনে আছে। আর তারপর মনে আছে, যে উত্তম মধ্যম কেলানি রুদ্র খেয়েছিল স্যারের কাছ থেকে মিথ্যে বলার জন্য। বেচারা রুদ্র!

হারানদা, চলে গেলে?


এই মানুষটিকে আমি শেষ দেখেছি বছর বারো আগে। আজও যখন মনে করতে চাই, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা খাটো ধুতি পরা, কৃষ্ণবর্ণ, মধ্যবয়স্ক, ছোটোখাটো চেহারার মানুষ। বাম হাতে সবসময় একটা ঘড়ি আর বৈষ্ণব। হারানদা, হারান নাপিত, সবাই যা বলে ডাকত। হারানদা ছিল আমাদের স্কুলের নাপিত! বিষয়টা পরিষ্কার করে দেই।

সকাল  ১০ টা থেকে সাড়ে ১০ টার মধ্যে যখন স্কুলের মেন গেট দিয়ে ছাত্ররা প্রবেশ করত, আমাদের প্রধান শিক্ষক মহাশয় স্কুলে প্রবেশের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এর একটাই কারন ছিল। ছাত্রদের চুল এবং নখ ছোটো করে কাটা নাকি তা পর্যবেক্ষণ করা। আর প্রধান শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত হারানদা। কোনও ছাত্রের চুল আর নখ বড় থাকলে, তাকে সোজা তুলে দেওয়া হোতো হারানদার হাতে। চুল ছোটো করে তবেই স্কুলে প্রবেশ। আমাকে যদিও কোনদিন হারানদার হাতে পড়তে হয়নি, তবু লোকটিকে আমার বেশ লাগত।

আজও আমার চুলের উচ্চতা দেড় ইঞ্চির বেশী কখনই যায় না। অনেকটা বলতে পারেন, যাকে আমরা বলি, বাটি ছাট (লালুর মত নয়)।  স্কুলের আবেশ রয়ে গেছে।

এর বাইরে আমি হারানদা কে দেখেছি, আমাদের স্কুলের মাঠের কোনায় কদম গাছের  তলায় বসে বিড়ি খেতে আর নিজ মনে রাধাকৃষ্ণের ভক্তিগীতি গাইতে। এছাড়া আমি তাকে আর চিনতাম না। কয়েকদিন আগে, এক স্কুলের সহপাঠীর সাথে পুরানো স্কুলের স্মৃতিচারণ হচ্ছিল। তখন কথায় কথায় জানলাম, হারানদা মারা গেছে। এই লেখাটা ছাড়া, হারানদা কে বাঁচিয়ে রাখার আর উপায় দেখলাম না।