Friday, August 31, 2012

বেনফিস এ বই!


তখন ক্লাস নাইনে পড়ি, খুব সম্ভবত। স্কুলে একজন নতুন ইংরেজির শিক্ষক এলেন। অল্পবয়স্ক, বেশ জিম করা পেটানো চেহারা; উনি নাকি ক্যারাটে ব্ল্যাক বেল্ট ছিলেন; খুবই ভদ্রলোক; বেশ ভালই পড়াতেন; নাম ঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত অরূপ।  ওনার চেহারা দেখে আমরা ছাত্ররা বেশ ভয়ে ভয়ে থাকতাম, ক্লাসে কোনও গণ্ডগোল না।

তখন কোলকাতা বই মেলা সবে শেষ হয়েছে। আমি সেই বছর বইমেলায় যাইনি। একদিন ক্লাসে অরূপ স্যার পড়া শুরু করার আগে জিজ্ঞেস করলেন, কে কে এবারের বইমেলায় গেছে? ক্লাসে যা হয়, সবাই হঠাৎ করে নিজেকে পুস্তকপ্রেমী প্রমাণ করতে চায়; অনেকেই হাত তুলল। তাদের বেশীর ভাগই সেইবারের বইমেলায় যায়নি।

এই না যাওয়া কিন্তু হাত তোলা ছেলেদের দলে, একজন ছিল রুদ্র। পুরো নাম মনে নেই। আর আমার সাথে স্কুল জীবনে বেশী কথাবার্তাও হোতো না। ওর একটু কথার উচ্চারণ করতে অসুবিধা হত, যা নিয়ে ক্লাসের ছাত্ররা ওকে অনুকরণ করে মজা নিত; খুবই বাজে অভ্যাস কিন্তু একটা বয়সে স্কুল জীবনে এগুলো হয়ে থাকে; সুখ স্মৃতি হিসেবেই রয়ে যায়।

তো, রুদ্র হাত তোলায়, রুদ্রকে অরূপ স্যার দাঁড় করান, জিজ্ঞেস করেন কোন স্টল থেকে কি বই কিনেছে। রুদ্র পড়ল ফাঁপরে! পাশ থেকে একটি অত্যুৎসাহী, বন্ধুর শুভচিন্তক ছেলে ফিস ফিস করে বলে, “ বল, বেনফিস থেকে বই কিনেছি।“ রুদ্র বন্ধুর ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে স্যারের কাছে প্রকাশ করল ওর পুস্তকপ্রেম।

স্যার রীতিমত আঁতকে উঠলেন, “বেনফিস এ বই!” আমার এখনও স্যারের মুখের এক্সপ্রেশন মনে আছে। আর তারপর মনে আছে, যে উত্তম মধ্যম কেলানি রুদ্র খেয়েছিল স্যারের কাছ থেকে মিথ্যে বলার জন্য। বেচারা রুদ্র!

হারানদা, চলে গেলে?


এই মানুষটিকে আমি শেষ দেখেছি বছর বারো আগে। আজও যখন মনে করতে চাই, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা খাটো ধুতি পরা, কৃষ্ণবর্ণ, মধ্যবয়স্ক, ছোটোখাটো চেহারার মানুষ। বাম হাতে সবসময় একটা ঘড়ি আর বৈষ্ণব। হারানদা, হারান নাপিত, সবাই যা বলে ডাকত। হারানদা ছিল আমাদের স্কুলের নাপিত! বিষয়টা পরিষ্কার করে দেই।

সকাল  ১০ টা থেকে সাড়ে ১০ টার মধ্যে যখন স্কুলের মেন গেট দিয়ে ছাত্ররা প্রবেশ করত, আমাদের প্রধান শিক্ষক মহাশয় স্কুলে প্রবেশের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এর একটাই কারন ছিল। ছাত্রদের চুল এবং নখ ছোটো করে কাটা নাকি তা পর্যবেক্ষণ করা। আর প্রধান শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত হারানদা। কোনও ছাত্রের চুল আর নখ বড় থাকলে, তাকে সোজা তুলে দেওয়া হোতো হারানদার হাতে। চুল ছোটো করে তবেই স্কুলে প্রবেশ। আমাকে যদিও কোনদিন হারানদার হাতে পড়তে হয়নি, তবু লোকটিকে আমার বেশ লাগত।

আজও আমার চুলের উচ্চতা দেড় ইঞ্চির বেশী কখনই যায় না। অনেকটা বলতে পারেন, যাকে আমরা বলি, বাটি ছাট (লালুর মত নয়)।  স্কুলের আবেশ রয়ে গেছে।

এর বাইরে আমি হারানদা কে দেখেছি, আমাদের স্কুলের মাঠের কোনায় কদম গাছের  তলায় বসে বিড়ি খেতে আর নিজ মনে রাধাকৃষ্ণের ভক্তিগীতি গাইতে। এছাড়া আমি তাকে আর চিনতাম না। কয়েকদিন আগে, এক স্কুলের সহপাঠীর সাথে পুরানো স্কুলের স্মৃতিচারণ হচ্ছিল। তখন কথায় কথায় জানলাম, হারানদা মারা গেছে। এই লেখাটা ছাড়া, হারানদা কে বাঁচিয়ে রাখার আর উপায় দেখলাম না।