ল্যাপটপের ব্যাগটা
গুছাচ্ছি, আর দশ মিনিটে ট্যাক্সি এসে যাবে, ভারতীয় সময় রাত ১০ টা, একটা বিদেশী
নাম্বার ভেসে উঠল ফোনে। বুঝলাম, যেখানে যাব, সেখানকার নাম্বার।
-
-হ্যালো
- -হ্যালো, আমার নাম হেনা,
আমি Silver Bird Guest House, কিতিলা
থেকে বলছি, আপনার বুকিং আছে আগামীকাল রাতের, ফোন করলাম আপনার আগামীকালের বুকিং
কনফার্ম করার জন্য। আপনি বুকিং . কম
এ এই বুকিং করেছেন।
- -হ্যাঁ,
ধন্যবাদ, হ্যাঁ আমি আসছি। আর দয়া করে আগামীকাল রাতে কিতিলা এয়ার পোর্টে ক্যাবের
ব্যবস্থা করে রাখবেন। কাল দেখা হচ্ছে তাহলে।
- -
নিশ্চয়ই,
ক্যাব ২৫ ইউরো নেবে, আমি বলে রাখবো, WELCOME.
এর থেকে বেশী কথা বলার
সময় ছিল না আমার। ট্যাক্সি এসে গেলো। ট্যাক্সিতে এয়ার পোর্টের দিকে যাওয়ার সময়,
বারবার মনে হতে লাগল, আরে মেয়েটির গলার আওয়াজ তো বেশ মিষ্টি, কি যেন নাম বলল,
হ্যাঁ হেনা। আরেকটু কথা বললে হত। ঠিক আছে, পরের দিন তো
দেখা হচ্ছেই।
পরের দিন খুব ভোরে
মিউনিখ নামলাম, সেখান থেকে ফ্লাইট ধরে
দুপুর বারোটাতে হেলসিঙ্কি। এখানে আমাকে অনেকক্ষণ প্রায় আট ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হত। কিতিলা
যাওয়ার ফ্লাইট রাত নটা। কিতিলার অবস্থান এবং তার এয়ার পোর্ট সম্পর্কে যাবতীয়
তথ্যের জন্য এই লিঙ্কটি দয়া করে দেখে নেবেন - http://en.wikipedia.org/wiki/Kittil%C3%A4_Airport
।
আমি কিতিলাতে কেবল এক
রাত থাকব, হেনার বাড়িতে। পরের দিন সকালে লেভি নামের এক গ্রামে যাব, ফিনল্যান্ডের আরও
উত্তরে। সেখানেই বাকি দিনগুলোর জন্য হোটেল বুকিং করা আছে।
কি করব আট ঘণ্টা
হেলসিঙ্কিতে? এয়ার পোর্টে এক গেলাস বিয়ার মেরে দিয়ে, ফিন এয়ারওয়েজের
জিম্মায় ব্যাগেজ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হেলসিঙ্কির আকাশ মেঘলা, মার্চ মাস, দুপুরবেলা,
-৫ ডিগ্রী, হালকা ঝিরিঝিরি বরফ পড়ছে। মিউনিখ থেকে এক প্যাকেট ক্যামেল সিগারেট
কিনেছিলাম, ধরালাম, কালো চশমাটা পরে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা এদিক ওদিক হেঁটে বেড়ালাম। ফুটপাথের এক দোকান
থেকে একটা রেন ডিয়ারের মাংসের র্যাপ আর এক গেলাস বিয়ার দিয়ে দুপুরের খাওয়া
সারলাম। রেন ডিয়ার খাব বলে বেশ কয়দিন ধরেই আমি একটু উত্তেজিত! এরপর এয়ার পোর্টে ফিরে এলাম, বিকেল পাঁচটা বাজে প্রায়। চেক ইন সেরে এয়ার
পোর্টে ঢুকে গেলাম। ঢুকে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একটি ওক ব্যারেল বিয়ারের দোকান
পেলাম। ব্যাস, আর আমাকে পায় কে? বিয়ার খেতে খেতেই চোখের সামনে সন্ধ্যে নেমে এলো
এয়ার পোর্টের বাইরে। গেলাস হাতেই অপেক্ষা করতে লাগলাম রাতের ফ্লাইটের।
কিতিলাতে ফ্লাইট নামল রাত
সাড়ে দশটা। ছোট্ট এয়ার পোর্ট, ফ্লাইট আসার দেড় ঘণ্টা আগে খোলে, নইলে বন্ধ থাকে।
ফ্লাইট থেকে দেখলাম বাইরে বড় বড় করে লেখা আছে -৩০ ডিগ্রী, চারদিকে পুরু বরফ।
ফ্লাইট থেকে নামতেই সারা শরীরে এসে লাগল ঠাণ্ডা হাওয়া। সব রকম গরম পোশাক পরা
সত্ত্বেও কাঁপছি, পা অসাড় হয়ে আসছে। ফ্লাইট থেকে নেমে কোনও বাস নেই এয়ার পোর্টে
এক্সিটের দিকে। বরফের ওপর দিয়ে ওরকম ঠাণ্ডায় রাত সাড়ে দশটায় হেঁটে এগিয়ে চললাম ব্যাগেজ
নিতে। ছবি তোলার বৃথা চেষ্টা, হাত কাঁপছে পুরো, ছবি ঝাপসা এলো।
ব্যাগেজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি, আমার বয়সী একটি ছেলে মুখে সিগারেট নিয়ে
আমার নামটি একটি ল্যাতপ্যাতে কাগজের ওপর লিখে দিব্যি ওই ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে আছে।
লাইটার হেলসিঙ্কি এয়ার পোর্টে চেকিনে দিয়ে দিতে হয়েছিল। এয়ার পোর্ট থেকে বেরিয়ে
প্রথমেই ওকে বললাম, আগুন দে ভাই। একটা ক্যামেল নিজেও জ্বালালাম, ওকেও দিলাম। ও ওই
সিগারেটটিও মেরে দিল। আমি পুরো সিগারেট খেতে পারলাম না বাইরে দাঁড়িয়ে, গা-হাত-পা
কাঁপছে আর সেই মারাত্মক ঠাণ্ডা হাওয়া। গাড়িতে উঠে বসতে না বসতেই পৌঁছে গেলাম হেনার
বাড়ি, এক কিলোমিটারও না, গাড়ির মিটার বলছে ২৯ ইউরো। আমি বললাম হেনা আমাকে ২৫ ইউরো
বলেছিল তো! ছেলেটি শেষমেশ ২৫ ইউরো নিয়েই কেটে পড়ল।
অবশেষে আমি পৌঁছলাম Lapland এ, এই অঞ্চলকে Samiland ও বলা হয়। Arctic Circle এর মধ্যে পৌঁছে গেছি!
রাত প্রায় এগারোটা, চারদিকে বরফ, হালকা তুষারপাত, ঠাণ্ডা হাওয়া, ফাঁকা রাস্তা, নীল ঘন
অন্ধকার, হেনার Guest House এর দরজার
সামনে আমি একা দাঁড়িয়ে। কোনও ইলেকট্রিক বেল নেই, কিছু ছোটো ছোটো ঘণ্টা ঝোলানো। ঋতুদার
The Last Lear শিখিয়েছে, কি করে এর ব্যবহার করতে হয়। বাজালাম ঘণ্টাগুলো, এক অদ্ভুত
সুন্দর মুখশ্রী বেরিয়ে এলো দরজা খুলে। একটা সুন্দর হাসি ঠোঁটের কোনায়, বলল, “হাই,
আমাদের পরিবারে স্বাগতম।” একটু হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে Guest House এর ভেতরে ঢুকে গেলাম।

