Thursday, January 12, 2012

“আসি ভাই”


আমার প্রতিটি সুদূরের সময়সাপেক্ষ ট্রেন যাত্রা এক অন্য মাত্রার অভিজ্ঞতা। ভারতীয় রেলের সাথে আমার এমনিতে কোনও শত্রুতা নেই, তবে অবশ্যই সময়ের অভাবে, সময় সময় কিছুটা পকেটের স্বভাবে তাকে নিকটাত্মীয় করে তুলতে পারিনি। খুব ছোটো থেকেই একটি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আমার আছে। প্রকৃতির ডাকে যখন তার পূর্ব অথবা পশ্চিম স্টাইল এর শৌচালয় ব্যবহার না করা ছাড়া আর উপায় থাকে না, তখন সেই অদ্ভুত ঝাঁকুনি স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মে বাধা দিয়ে বড়ই বিব্রত করে। তবু সব বাধা বিপত্তিকে পাশে সরিয়ে রেখে, হাওড়া থেকে আরেকবার চেপেই বসলাম একটি বাতানুকূল কামরায়; গন্তব্য বম্বে, সময়সীমা ছাব্বিশ ঘণ্টা!

     আমার সিটের উল্টোদিকে এক বাঙ্গালী কাকু-কাকিমা। ওনারা বম্বেতে ওনাদের আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছেন। আর আমার ওপরের বার্থে একটি বাঙ্গালী ছেলে, বয়স সাতাশ কি আঠাশ; মুখটি অত্যন্ত গম্ভীর, খুব চিন্তার মধ্যে আছে মনে হল। এবারেও আমার বয়সী কোনও মহিলা সহযাত্রী পেলাম না, সকালে নিশ্চয়ই নিজের মুখ দেখে উঠেছি। ট্রেন ছাড়ল ঠিক সময়ে। আমিও নিজের মত ম্যাগাজিন পড়া, ল্যাপিতে একটু কাজকর্ম করায় নিযুক্ত হলাম। কিছুক্ষণ পরের থেকেই ছেলেটির ফোনে বাক্যালাপ শুরু হল বিভিন্ন লোকজনের সাথে এবং তা চলল পরের দিন বম্বে নামার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত, শুধু রাতের ঘুমানোর সময়টুকু বাদ দিয়ে। তার ফোনে কথপকথন অবশ্যই আমার সব কাজে বিঘ্ন ঘটাতে শুরু করল কিন্তু তাকে কিছু বলতে পারলাম না কারন বিষয়টি অত্যন্ত গম্ভীর। তবে তার সারমর্ম দাঁড়ায় এই -ছেলেটি বম্বেতে কোনও ব্যবসা করে। কিছুদিন আগে বাড়ির লোকদের অমতে  বিয়ে করেছে। এখন মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি আসতে চাইলে মেয়েটির বাড়ি থেকে আপত্তি জানানো হচ্ছে। এই বিষয়ে তারা আইনত কোনও ব্যবস্থাও নিতে চলেছেন।

    কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা ঘামানোর কোনও ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু ছেলেটির এই অবস্থা দেখে আমার নিজের খুব খারাপ লাগল। হয়ত সে কোনও অন্যায় কিছু করেনি কিন্তু নিঃসন্দেহে এখন অত্যন্ত চিন্তার মধ্যে রয়েছে। তার ওপর  কর্মসূত্রে ঠিক এইসময়ই ওকে বম্বে আসতে হচ্ছে। কিন্তু গোটা ট্রেনে আমি আগ বাড়িয়ে এই বিষয় নিয়ে কোনও কথা বললাম না, অন্য কোনও বিষয় নিয়েও তার সাথে আমার কথা হয়নি।

     ট্রেন বম্বেতে ঢুকছে, নামতে যাব, আমার সামনে ছেলেটি দাঁড়িয়ে। ছেলেটির পিঠে আলতো টোকা মেরে ডাকলাম, বললাম, “ভাই আমার নম্বরটা রেখে দাও। যদি উকিলের দরকার হয় আমাকে জানিও। আমি উকিল নই, তবে জানাশোনা ভালো একজন অভিজ্ঞ উকিল আছেন, এইসব বিষয়ে খুব পাকা, নিজে জীবনে বিয়ে করেননি। চিন্তা নেই, সবকিছু ভালই হবে। আসি ভাই।“

     নাম্বারটি দিয়ে নেমে গেলাম, হাঁটতে লাগলাম ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে।

1 comment:

  1. নয় ঘন্টার উপরে কখনো ট্রেন যাত্রা করিনি। আর ছোট্ট একটা দেশে এতো লম্বা ট্রেন যাত্রার সুযোগও নাই।

    ট্রেনের ঝাঁকুনিতে শৌচাগারে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করা মুশকিল ঠিকই, তারপরেও দূরপাল্লার বাসের চেয়ে ভাল। বাসের মধ্যে তো এই কর্ম সম্পন্ন করারই কোনো সুযোগ নেই!

    পরোপকার করার প্রচেষ্টার জন্যে অভিনন্দন।

    ReplyDelete