আমার স্কুল জীবন কেটেছে এক রামকৃষ্ণ মিশনে। আজ যে ঘটনাটি মনে পড়ল আর মনে হল সবাইকে জানাই, সেটি আজ থেকে বহুদিন আগের, আমি তখন ক্লাস সেভেন এ পড়ি। আমাদের ক্লাসরুম ছাত্রদেরই পরিষ্কার রাখতে হত। অর্থাৎ ঝাঁট দিয়ে সাফ রাখার দায়িত্ব ছাত্রদেরই ছিল। ক্লাসর এর কোণ ছাত্র কবে ঝাঁট দেবে, তার একটি তালিকা ক্লাস এর সামনে টাঙ্গানো থাকতো আর সেই কাজ ঠিক মত হচ্ছে কিনা দেখার দায়িত্ব থাকতো ক্লাসেরই একজন ছাত্রের ওপর, তাকে বলা হত "ঝাড়ু কাপ্তেন"। ক্লাসরুম ঝাঁট দেওয়া হত দুইবার- সকালে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আর দুপুরে টিফিনের পর।
সেইবার আমার দায়িত্ব পড়েছিল বুধবার টিফিনের পরে, ক্লাস ঝাঁট দেওয়ার। যা হত, টিফিনের সময় মাঠে খেলে আমি দেরী করে ক্লাস এ ঢুকতাম আর আমার ঝাঁট দেওয়া অধিকাংশ দিনই হত না। আমাদের হেড মাস্টার মহারাজ টিফিনের পর গোটা স্কুল একবার ঘুরে দেখতেন। ক্লাস এর মধ্যে নোংরা দেখলে ছাত্রদের সাবধান করে দিতেন। ঠিক একই ব্যাপার হয় ক্লাস সেভেন- সি , অর্থাৎ আমার সেকশনে। মহারাজ পর পর দুই সপ্তাহ আমাকে সাবধান করে যান, আর শব্দ আমার কানে সরল রেখায় চলে। তৃতীয় বুধবার সেই একই ব্যাপার হওয়ায়, উনি আমাকে ওনার রুম এ ডেকে পাঠান।
আমি গেলাম, হাত পাতলাম, প্রায় তিরিশ খান বেতের বাড়ি দুই হাতে খেলাম, চলে এলাম। হাতের অবস্থা আর বলে দিতে হবে না। মুখ চোখ লাল হোয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু কান্না আসেনি। রাতে চামচ দিয়ে খেয়েছি।
পরের দিন অফিসের গৌতমদা টিফিনের সময় ডেকে বলল মহারাজ আবার ডাকছেন। সেদিন মারলে আর লাগত না। যেতেই মহারাজ ওনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বললেন। বসলাম। গৌতমদা সামনে একটা প্লেট রেখে গেলো। মহারাজ ওনার যে দুপুরের খাবার এসেছিল, তার থেকে সেই প্লেট এ নিজের হাতে ভাত আর বেগুন পোড়া বেড়ে দিলেন আমাকে আর খাওয়া শুরু করতে বললেন। খেলাম। যেটুকু রাগ মনের মধ্যে জমা হয়েছিল, এক মুহূর্তে চলে গেলো। চোখ অল্প ভিজে এসেছিল। উনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে এক দিন এই বেতের বাড়ি আর এই বেগুন পোড়ার গুরুত্ব আমি বুঝতে পারব।
আজ যত বড় বড় রেস্টুরেন্ট এ যতরকম খাবার খাই, তাদের স্বাদ সেই বেগুন পোড়ার থেকে হাজার গুনে ভালো। কিন্তু আজ আমি যতটুকু হতে পেরেছি, সেই বেগুন পোড়া আর ভাত তার জন্য অনেকটাই দায়ী।
No comments:
Post a Comment