Wednesday, February 8, 2012

ঘেটো ও ছাঁকনি

২০০৫ সাল। আমার এক বন্ধু অজয় এর নিমন্ত্রনে কলকাতার উপকণ্ঠে এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে উপস্থিত হলাম হোলির দিনে, সকাল সকাল। অজয় অনেক করে বলেছে; ওর নাকি অনেক সুন্দর সুন্দর গোপিনী জুটেছে এখানে, তাদের সাথে আলাপ করিয়ে দেবে। হোলি খেলারও সুযোগ জুটবে নাকি সেই মহিলাদের সাথে, তাই আর বন্ধুকে না করতে পারিনি; আর সদ্য সেই সময় ক্ষত থেকে উঠেছি। খুব বেশি সকালেই উপস্থিত হলাম, দরজায় লাথি মেরে অজয়ের ঘুম ভাঙাতে হল। ঘর তো নয়, একটা জলজ্যান্ত সিগারেটের শ্মশান, বেঁচে আছে কি করে? অজয়ের ঘরে বসবাসকারী অন্য জীবটি তখনও অদ্ভুত ভাবে  মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছে, ওর নাম গৌরব, শোওয়া দেখলেই বোঝা যায় কিসের স্বপ্ন দেখছে। অজয় বলল কাল একটু বেশি টেনেছে গৌরব, চিন্তা নেই, একদম লাঞ্চের আগে উঠবে। দুই বন্ধু বেরিয়ে গেলাম, সামনে মাসীর দোকানে চা আর সিগারেট নিয়ে বসলাম। একটু পরে আরেকটি প্রাণীর সাথে সেখানে আলাপ, নাম সানি। গল্প চলছে।

     হঠাৎ করে সানি অজয়কে জিজ্ঞেস করল, রাতের সব প্ল্যান ঠিকঠাক কিনা। অজয় জানাল আমাদের চিন্তা করার কোনও কারন নেই, গুরুদেব একা নিজের দায়িত্বে সব করে দেবে বলেছে। ভীষণ কৌতুহল নিয়ে সুখটান দিতে লাগলাম। কিই বা প্ল্যান আর কেই বা সে গুরুদেব! 

     যাই হোক, সকাল ১১ টা থেকে রঙ খেলা শুরু হল। কিন্তু সেই গুরুদেবকে দেখতে পেলাম না। রমণীদের সাথে কলেজ জীবনে সেইটাই আমার শেষবারের মত হোলি খেলা। একজন খুবই সুন্দরী, অজয়ের এক বান্ধবীকে সেদিন সামান্তা ফক্স নাম দিয়েছিলাম। সামান্তার সাথে সেদিনের পর আর দেখা হয়নি। ২০১০ সালে চেন্নাইতে একদিন হঠাৎ সামান্তার সাথে দেখা হয়েছিল, ১০ মিনিটের জন্য। সামান্তা সেখানেই একটি কোম্পানিতে এখন চাকরি করছে। কিছু স্মৃতি  নিজের মধ্যে থেকে গেলেই মধুর।

     হোলি খেলার পর দুপুরে খিদে আর ঘুম দুটোই জবরদস্ত গতিতে তেড়ে আসে। পেট পুরে খেয়ে বিকেল ৪ টের সময় ঘুমের মধ্যে ডুবে গেলাম বন্ধুর ঘরে; কখন সন্ধ্যে গড়িয়ে ৭ টা বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি। অজয়ও ঘুমিয়ে চলেছে। হঠাৎ করে ঘরের বাইরে থেকে তারস্বরে বাংলায় অতীব শ্রুতিমধুর কিছু শব্দ দরজাকে ভেদ করে ঢুকে আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিলো। যে ভদ্রলোক বাইরে থেকে চিৎকার করে আমাদের জন্য এত সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যয় করছেন, তার আসল উদ্দেশ্য হল আমাদের ঘুম থেকে তোলা এবং রাতের সেই প্ল্যানে আমাদের কাজে লাগানো। "এই রে ঘেটো!", বলেই অজয় তিড়িং করে  উঠে ঘরের দরজা খুলে দিলো। দেখলাম একজন মানুষ প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, ৪৬ কোমর, প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাক বডি, ঢোলা পায়জামা, হাতে বিড়ি নিয়ে কাঁচা বাংলায় অজয়কে খিস্তি মারতে মারতে ঘরে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই আদেশ, "যা, তলার মেস থেকে তিনটে বড় গামলা নিয়ে আয়। না বললে আমার নাম নিবি। বাকি সব রেডি। গৌরব আর সানিকে ডেকে নে।" অজয় চলে গেলো। বুঝলাম ইনিই সেই গুরুদেব। আলাপ করলাম। ঘেটোর আসল নামটা উল্লেখ করলাম না। ওর বাড়ি ঘাটালে বলে ওকে সবাই ওই নামে ডাকে। দেখে প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু এরকম দিল খোলা মানুষ আমি জীবনে কমই দেখেছি।

     সবাই একত্রিত হলাম ঘেটোর ঘরে। আমি, অজয়, সানি, গৌরব আর ঘরের মালিক। তিনটে গামলা রেডি। এবার দেখলাম ব্যাগের ভেতর থেকে কি কি বেরোচ্ছে। পুরো ঘাবড়ে গেলাম। জীবনে কোনোদিন ভাঙ বা সিদ্ধি কোনটাই খাই নি। শুনলাম ঘেটো নাকি পুরো ব্রহ্মাণ্ড দেখাবে বলে ৩০০ গ্রাম সিদ্ধির সাথে ৩০০ গ্রাম ভাঙের গুলি মিক্স করে এনেছে। গুরুদেব নিজ হাতে সেই মিক্সচার প্রায় ১০ প্যাকেট আমুল টেটরা প্যাকডের সাথে গামলায় গুলতে লাগলেন। এরপর, তার মধ্যে দু ডজন কলা, কাজু, কিসমিস, বাদাম বাটা, ৭৫০ গ্রাম রসগোল্লার রস, আরও ৫০০ গ্রাম চিনি, কালো আঙুর মেশালেন, শেষে ওনার আঙুলের তামার আংটিটি বেশ ভালো করে ঘষে দিলেন। যে মনোযোগের সাথে যত্ন নিয়ে উনি এই পানীয় তৈরি করছিলেন, স্বয়ং সঞ্জীব  কাপুরও লজ্জা পেয়ে যেত।

     অবশেষে পানীয় সেবনের উপযুক্ত হল। আমরা সবাই নিজ নিজ গ্লাস বাড়িয়ে দিলাম। ঘেটো সবার গ্লাসের ওপর একটি ছাঁকনি রেখে, ছেঁকে ছেঁকে আমাদের পানীয় দিতে লাগল এবং নিজেও তৃপ্তির সাথে পান করতে লাগল। আমিও "জয় বজরং বলি" বলে প্রায় ৭-৮ গ্লাস সেবন করেই নিলাম। যখন সবার পান প্রায় শেষ, তিনটে গামলা পুরো খালি, যে যে ঘটনা গুলি ঘটেছিল, তা নীচে বর্ণনা করছি-

- যখন সবার শেষ গ্লাস চলছে, তখন সবাই বুঝছে যে কিছু একটা হচ্ছে। কিন্তু সবাই সবার দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করছে যেন সে নিজে পাঁচ অক্ষরের চালাক, বাকি সবাই চার অক্ষরের বোকা।

- খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না ভেবে, আমি উঠে অজয়ের ঘরে চলে এলাম। ভাবলাম শুয়ে পড়ি। একটি টি শার্ট আর বারমুডা পরে শুয়ে পরলাম। শোয়ার পরে আমার প্রথম চিন্তা, আমি কোন দিকে মাথা দিয়ে শোব। যাই হোক, একটি চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে থাকলাম।
- কিছুক্ষণ পরে ভাবলাম যে যদি একটু স্নান করে নেই, তাহলে হয়ত আর অস্বস্তি লাগবে না। জামা কাপড় না ছেড়ে, গামছা না নিয়েই স্নানে গেলাম রাত ১১ টায়।

- ওদিকে, যে ঘরে খাওয়া হচ্ছিল, অজয় সেই ঘরের মেঝেতে আর গৌরব খাটে লুটিয়ে পড়ে ঘুমিয়ে গেছে। সানি খেলা দেখাচ্ছে। সানি ঘেটোকে বলল, "আমার শুয়ে পড়লে কষ্ট হচ্ছে।" ঘেটো, "তাহলে বসে থাক।" সানি, "আমার বসে থাকলেও কষ্ট হচ্ছে।" ঘেটো, "তাহলে তুই মাঝামাঝি থাক।" শুনেছিলাম পরে, ওই গোটা রাত সানি একটা অদ্ভুত ভাবে না শুয়ে, না বসে বিছানায় এলিয়ে রেখেছিল নিজেকে।

- সানিকে সেই বিচিত্র আসনে বসিয়ে ঘেটো গোটা হোস্টেল ঘুরতে বের হয়।

- এদিকে আমি বাথরুমে, স্নান করতে গেছি। যেই বাথরুমের দরজা লাগাতে গেলাম, মনে হল, ছিটকিনি লাগানো ঠিক হবে নাকি, যদি আমার ভেতরে কিছু হয়ে যায়, লোকে তো আমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু দরজা খোলা রেখে স্নান করলে লোকে কি ভাববে! তাই দরজায় ছিটকিনি না দিয়ে, দরজাটি ভেজিয়ে আমি পোশাক না ছেড়েই সাওয়ারের তলায় প্রায় ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। 

- বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা ঘরে, গা দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, অন্য ঘরের ছেলেরা তাকিয়ে আছে। হ্যাঁ, ঘরে গিয়ে ভেজা জামাকাপড় ছাড়লাম। তারপর শুতে গেলাম।
- ১০ মিনিট শোয়ার পরেই, মনে হতে লাগল, আমি একটা অন্ধ গুহার মধ্যে দিয়ে প্রায় আলোর বেগে ছুটে চলেছি আর ছুটে চলেছি। হঠাৎ করে আমি চিৎকার করতে লাগলাম, "আমি আর যাব না। আমাকে ফিরিয়ে আন, ফিরিয়ে আন। ও সেলুকাস, আমাকে ফিরিয়ে আন।"। এই চিৎকারে আশে পাশের ঘর থেকে ছেলেরা ছুটে আসে। আমাকে সান্তনা দিতে থাকে। আমি নাকি তখন রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছি। 

- এইসব গণ্ডগোল শুনে ঘেটো কোথায় ছিল কে জানে, ঘরে উপস্থিত হল আর আমাকে জিজ্ঞেস করল, "কি হয়েছেটা কি?" আর তখন আমি  ঘেটোকে দেখে যে অট্টহাসি শুরু করেছিলাম, তা সকাল ৬ টা অব্দি থামেনি।

     আমার কান্নার পরেই এই হাসিটার কারন হল, ছাঁকনি। আমাদের চার জনের অবস্থা খুবই করুন মনে হতে পারে আপনাদের, কিন্তু আপনারা ঘেটোর অবস্থাটা ভাবুন। ঘেটো পান করার পর ৪ ঘণ্টা সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু হাতের থেকে ছাঁকনিটা ছাড়েনি। 

     তারপরের ৩ টে দিন জীবন থেকে মুছে গেছে। ওই ৩ দিন সব কাজই করেছি, কিন্তু একটা ঘোরের মধ্যে, কিছুই মনে নেই। নমস্কার! আর না! ওটাই আমার জীবনে প্রথম এবং শেষবার ভাঙ খাওয়া। তবে একজন বন্ধু পেয়েছিলাম ওই দিন, ঘেটো।

*        *        *

ঘেটোর সাথে আবার দেখা ২০০৯ সালে, ব্যাঙ্গালোরে; ও একটি  সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করছে তখন। এক সপ্তাহ স্রেফ ছুটি কাটাতে গেছিলাম। তখনও কোমর ৪৬। 
      এখন ঘেটো কলকাতায় অন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করছে। মদ্যপান, ধূম্রপান সব বন্ধ। কোমর শুনেছি ৪০ এর কম। ঘেটো এখন বিবাহিত সংসারী মানুষ।   

No comments:

Post a Comment