স্কুল জীবন থেকেই একটু খ্যাপাটে ছিল সৌম্য;
এমনিতে চুপচাপ, ক্লাসে শেষ বেঞ্চে বসত, কারও সাতে পাঁচে নেই, নিজের মত থাকত। কিছু
জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতেও পারে, নাও পারে, ওর মুডের ওপর। ইতিহাস ক্লাসে কোনোদিন
পড়া পারত না, রোজ রেগুলারিটি বুকে বাড়িতে চিঠি যেত। বাবা-মা কে দিয়ে সেই চিঠি সই
করাতো না, কে জানে, কে সই করে দিত। টিফিনে খেলতে যেত না কোনোদিন। আমার সাথে সৌম্যর
বন্ধুত্ব অনেক পরে, ক্লাস সেভেনে, সেটাও হয়েছিল অদ্ভুত ভাবে।
স্কুলে আবৃতি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছি সাহস করে।
বাংলা স্যারের মাথায় কি ভূত চেপেছিল কে জানে, রবীন্দ্রনাথের “আফ্রিকা” আবৃতি করতে
হবে। হে ভগবান, আমার যে আর কিছুতেই মুখস্ত হয় না। সুকুমার রায়ের কবিতা খুব সহজে
মুখস্ত করে পাড়ার বিজয়া সম্মিলনীতে ছোটো থেকে বলে আসছি, এখন “আফ্রিকা”? স্কুলের
হলে যখন প্রতিযোগিতা শুরু হল, প্রতিযোগীরা সব একত্রিত হয়ে ব্যাক স্টেজে বসে। দেখি
সৌম্য, আমার তো চক্ষু ছানাবড়া! সূর্য কোনদিকে উঠেছে ভাই? সৌম্য কবিতা বলবে? ভরসা পেলাম, আর যাই হোক, সৌম্যর
থেকে আমি অন্তত ভালো বলব। প্রতিযোগিতা শেষ হল, ফল ঘোষণা হল, “আফ্রিকা” বলে প্রথম
হয়েছে সৌম্য; একটু গলাটা ঝেড়ে কেশে বলি, আমি হয়েছিলাম দ্বিতীয়, অনেক বড় বড়
হনুমানের থেকে ভালোই বলেছিলাম। এখন “আফ্রিকা” মনে নেই, প্রায় ভুলেই গেছি।
অনুষ্ঠানের পর, অনেক
মুড নিয়ে আমাকে সৌম্য বলেছিল, “তোকে কবিতার মুডটা আরও ভালো করে ধরতে হত।“ লে পচা!
সেদিন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব শুরু। অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা, কিন্তু যে স্থান আর
ঘটনাগুলি আজ মনে পড়ছে, তা সংক্ষেপে বলি।
* * *
সবে স্কুল জীবন শেষ হয়েছে, ২০০২ সাল। অনেক বড় হয়ে গেছি। ধোঁয়া টানতে শিখেছি, পানীয়
সেবনেও হাতে খড়ি হয়ে গেছে, বোতল দেখলেই ছুক ছুক করে, প্রথম প্রেম করছি সে সময়, যদিও
হাতে মোবাইল নেই, ফোন বুথ ভরসা। স্কুলের তিন মার্কামারা বন্ধু- আমি, সৌম্য আর
রাহুল ঠিক করলাম, এবারের ২৫ শে ডিসেম্বর বোলপুরে কাটাব। যেমন প্ল্যান, আর কোনও
কিছু না ভেবে ২৪ তারিখ তিন দিনের মত জামাকাপড় গুছিয়ে হাওড়া থেকে বিশ্বভারতী ফাস্ট
প্যাসেঞ্জারে চেপে সোজা বোলপুর।
ট্রেনে উঠে দেখি, রাহুলের চেহারায় একটা বেশ ঝিলিক দিচ্ছে। রোগা পাটকাঠির মত
চেহারা, টোকা দিলে পড়ে যাবে, ওরকম মিচকি মিচকি হাসছে কেন? সৌম্য আমাকে ফিসফিস করে
বলল, “শালার বাঁ হাতের আঙুলের আংটি টা দেখ!”। ওমা! কলির কেষ্ট যে! “হ্যাঁ রে
রাহুল, আংটির কেস টা কি?”
-“নবনিতা (আস্ত মাথামোটা) দিয়েছে” ,রাহুলের মুখে সে কি হাসি! মোনালিসাও লজ্জা
পেয়ে যাবে।
- “সোনার রিং নাকি!”
-“না, জল করা”
-“নবনিতার এত টাকা আসছে কোথা থেকে?”
-“সে তো ওর বাপ বুঝবে, তোর কি”
-“ও ও ও”, চুপ হয়ে গেলাম, বেশি ঘাঁটালাম না।
বোলপুর পৌঁছে লজ খুঁজতে অসুবিধা হল না। ওইটাই স্টেশন চত্বরে সব থেকে সস্তার লজ
ছিল বোধহয়। আর তো উপায় নেই। সবাই তো বাবার হোটেলে খাচ্ছি তখন। নামটাও মনে আছে, “অদ্বৈত
লজ”। প্রতিদিন ডবল বেড রুমের ভাড়া ৬০ টাকা।
ওইদিন বিকেলটা শান্তিনিকেতনের ভেতর “নন্দন” এর সামনে কিছুক্ষণ বসে আর লেডিস
হোস্টেলের সামনের মাঠে সন্ধ্যে পর্যন্ত বসে আড্ডা মেরে কেটে গেলো। তখনও
শান্তিনিকেতনের ভেতর অবাধে ইচ্ছে মত ঘোরা যেত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল তখনও
অক্ষত, চুরি যায়নি।
রাতে লজে এক বোতল “রাজকীয় নীল” খোলা হল। কি করব ভাই? গরীবের হুইস্কি! তখন পয়সা
কোথায়? এখন আমি ওর গন্ধও সহ্য করতে পারব না, বয়স হচ্ছে তো! মদ্যপান ছাড়া বোলপুরে
গিয়ে লোকে আর যেসব কুকীর্তি করে, আমরা তা করিনি, আমরা ভদ্র ছেলে!
পরের দিন সকালে উঠে চিন্তায় পড়ে গেলাম, কি করব সারাদিন। লজের সামনের চায়ের
দোকানে চা খেতে খেতে চাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, “আপনারা ‘আমার কুটীর’ ঘুরে
আসেন না কেন? বাস স্ট্যান্ডে চলে যান, জিজ্ঞেস করুন, বাসে ১০-১৫ মিনিট। ঘুরে আসুন।“
চল, ঘুরে আসাই যাক। বাসে উঠতে যাব, সৌম্যর কি খেয়াল হল, বলল “আমি বাসের ছাদে
চললাম।“। আর কি! বন্ধুকে সাহচর্য দিতে, আমরাও ছাদে।
অনেকেই হয়ত জানেন, “আমার কুটীর” একটা হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ওখানে গিয়ে
আমাদের মনে হল শুধু দেখা ছাড়া তো আর কিছু করার নেই। সৌম্য হঠাৎ উধাও। কিছুক্ষণ
পর ফিরে এসে বলে, “চল, সারাদিন আড্ডা দেওয়ার একটা মোক্ষম জায়গা পেয়েছি।“ বলে
আমাদের “আমার কুটীর” এর পিছনে নিয়ে গেল,
দেখলাম একটা সরু নদী, নাম কোপাই, মাঝ নদীতে হয়ত কোমর পর্যন্ত জল। কিছু গ্রামবাসী
নদীর ধার দিয়ে কাদা মাটি থেকে গুগলি শামুক ধরছে। জায়গাটি এমনিতে দৃশ্যত খুব সুন্দর
নয়, কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। তিনজনে সিগারেট জ্বালিয়ে বসে গেলাম। দুপুর
গড়াতেই কি খেয়াল হল, যে ওই কাদামাটিতে কোপাই এর জলে স্নান করব, উৎসাহ সব থেকে বেশি
সৌম্যর। আমি তো একটু কিন্তু কিন্তু করছি। জিন্স পরেই ঝাঁপ দিতে হল কোপাইতে। ওটি
আমার খুব সখের একটি নিউপোর্ট ব্লু জিন্স ছিল।
স্নান করতে গিয়ে সে এক কাণ্ড! রাহুলের আঙুল থেকে আংটিটি জলে পড়ে গেছে। ছেড়েছে!
নবনিতা তো রাহুলকে খুন করে দেবে। বন্ধুকে নিয়ে যতই ঠাট্টা করি, ওর অবস্থা দেখে
সত্যি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। দেবদূত বলে যদি কিছু থাকে, সেদিন দেখেছিলাম। বললে
বিশ্বাস করবেন না, একজন কাদামাটি থেকে গুগলি খুঁজে বের করছিল, সে রাহুলের আংটির
কথা শুনে নিজেই প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে খোঁজার পর কাদা থেকে উদ্ধার করেছিল আংটিটিকে।
ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আর কিছু দেওয়ার ক্ষমতা তখন আমাদের ছিল না। অন্য কিছু দিলে হয়ত তাকে অপমান করা হত। নবনিতা আর রাহুলের
সম্পর্ক আরও দেড় বছর টিকেছিল।
ভেজা জিন্স, টি শার্ট পড়েই কোপাইয়ের তীরে বসে রইলাম। আমরা গল্প কমই করলাম, চুপ
করেই বেশি সময় কাটালাম। একটু দূরের এক পাড়ার দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট বিস্কুট কিনে
আনা হল। বিকেল গড়িয়ে গোধূলি। কোপাই ছাড়িয়ে দূরের আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, আমরা
তখনও বসে আছি। সৌম্য প্রায় পাঁচ বছর পর আবৃতি করল, “আফ্রিকা”। যখন প্রায় অন্ধকার
হয়ে আসছে, আমরা রওনা দিলাম বোলপুরের দিকে। ওই দিনটা আজও আমি ভুলিনি। ভেবেছিলাম,
বাকিরা ভুলে গেছে, হয়ত আমি ভুল ছিলাম।
* * *
এপ্রিল, ২০০৫ সাল। আমার কিছু ব্যক্তিগত ব্যপারে সৌম্যর অহেতুক নাক গলানোর ফলে,
কিছু জিনিস খুব বাজে ভাবে কেঁচিয়ে যায়। আজ জিনিসগুলো খুব সামান্য মনে হলেও, আমি
আজও মনে করি, দোষটা সৌম্যরই ছিল। আমাদের বন্ধুত্ব মোটামুটি ওই বছরেই পুরো শেষ হয়ে
যায়। কেউ কারও কোনও খোঁজ রাখিনি, কোনোভাবে।
* * *
এপ্রিল, ২০০৮ সাল। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কলকাতা শাখার একজন ছাত্র সদস্য
হিসেবে আমি এবং আরেকজন বন্ধু বোলপুরে সেই সংস্থার একটি শাখার উদ্বোধনে আমন্ত্রিত
হই। মনে আছে, প্রচুর বাজে জ্ঞান দিয়েছিলাম সেইদিন, সারাদিন ধরে। আমাদের থাকার
ব্যবস্থা করা হয়েছিল বিশ্বভারতীর গেস্ট হাউসে। ওনাদের কাছে আবদার করে আরও একটি দিন
বেশি থাকার অনুমতি নিয়ে নিলাম। পরের দিন সকালে বন্ধুটি বলে যে সারাদিন কি করা যায়?
বললাম ওকে যে বিকেলে একটি জায়গায় নিয়ে যাব। বিকেলে উপস্থিত হলাম সেই জায়গায়,
কোপাইয়ের তীরে। এক ঘণ্টা বসে থাকার পর কি হল জানি না, মনে হল সৌম্যর সাথে কথা বলি।
লাগালাম, ওর পুরনো হাচের নাম্বারটা (আমি নাম্বারটা সেদিন পর্যন্ত ডিলিট করিনি)। ওদিক
থেকে আওয়াজ এলো
-“হ্যালো”
-“হ্যালো, সৌম্য আছে?”
-“দাদা তো দিল্লীতে থাকে। আমি ওর ভাই বলছি“
-“ওর নাম্বারটা পাওয়া যাবে কি? আমি ওর স্কুলের বন্ধু বলছিলাম”
-“দাদা আমাদের সাথেই প্রায় যোগাযোগ রাখে না। আর কাউকে নাম্বার দিতে ও না করেছে, সরি।“
-“ঠিক আছে। রাখছি”
রাহুল ততদিনে আমেরিকা চলে গেছে। মনে পড়ল, সত্যিই তো, সৌম্য কোনোদিন ওর বাড়িতে
নিয়ে যায়নি আমাদের, বাড়ির লোকদের কোনও কথাও বলেনি কোনোদিন। স্কুলেও কখনও দেখিনি ওর
বাবা বা মাকে। জানিনা।
সেটাই আমার শেষবারের মত কোপাইয়ের তীরে যাওয়া, এখনও পর্যন্ত। রাতে গেস্ট হাউসে
ফিরে নাম্বারটা ডিলিট করে দিলাম।
* * *
গতকাল রাতে একটু তাড়াতাড়ি শুতে যাচ্ছি, সকালের ফ্লাইট।
ঘুমটা প্রায় এসেছে, রাত ১ টা। একটা ফোন এলো।
-“হ্যালো”
-“কেমন আছিস?”, একটা ভারী গলা।
-“কে?”
-“সৌম্য বলছি।“
আমি তো হতবাক। কোনও খোঁজ নেই, পাত্তা নেই, হঠাৎ করে
আজ, কি ব্যপার?
-“মার্চ সেকেন্ড উইক বম্বে যাচ্ছি। এক সপ্তাহের জন্য।
থাকার ব্যবস্থা করে রাখিস। সব ডিটেল এই নাম্বারে মেসেজ করে দিচ্ছি। রাখলাম”, বলে
ফোন কেটে দিল।
মালটা, আজও খ্যাপাটে। মার্চ সেকেন্ড উইক তাহলে!
Picture taken from the Site: http://weekenddestinations.info/2011/distance/within-200-kms/sonajhuri-santiniketan-165-kms-from-kolkata/
amar ek bondhur kopaai-sombondhio nesha royechhe. tomar lekhaay porlaam. kopai'er bodh hoy kono maaya achhe. Bondhutwer cheye nibir bodh hoy purush'er kichhu hoy na.
ReplyDeleteMarch'er por ei post'ei ekta songjojon jure dio.