Monday, June 17, 2013

ফাঁকা প্রেম



এই ঘটনাটি লিখতে গিয়ে “ফাঁকা প্রেম” নামটাই বেছে নিলাম। কারন যেদিন ভেবেছিলাম এই ছোট্ট কয়েক ঘণ্টার কথা লিখব, সেদিন ফ্লাইটে ছিলাম আর অনুপমের “ফাঁকা ফ্রেম” শুনছিলাম। আমি অনুপমের গানের খুব একটা ভক্ত নই, তবে এই ক্ষেত্রে এই নামটা আমার বেশ উপযুক্ত মনে হল, অনুপমের গানটার থেকে কিছুটা অনুপ্রাণিত হয়ে। এটি কোনও সেন্টি খাওয়া প্রেমের গল্প নয়, আবেগ নিংড়ে লেখা নয়, শুধু ঘটনাটি লেখা। এতে কোনও ব্যক্তিবিশেষকে অপমান করার ইচ্ছে নেই, পাঠকদের থেকে “আহা আহা...আহারে...ইসস” শোনারও ইচ্ছে নেই।  এতে কারও ব্যক্তিগত কথা বাজারি করা হচ্ছে না।

­গতকাল
বেসোঁতে কদিনের কাজ।  সেইন্তে ভঁআতে অতনু থাকে। ওর ওখানেই ওঠার কথা, একদিন থেকে, পরের দিন বেসোঁ। অতনুকে বারবার বলে দিয়েছি, আমার পাহ্রী আসার কথা আর কাউকে না জানাতে, আর কারও সাথে দেখা করার ইচ্ছে ও সময় কোনটাই নেই। দ্য গলে অতনু আমাকে নিতে আসতে পারেনি, আমি সকাল সকাল নেমেছি আর ওকেও কর্মক্ষেত্রে বেরোতে হবে। ট্যাক্সি নিতে বলেছে। আমি ওর এপার্টমেন্টে পৌঁছালেই, ও বেরিয়ে যাবে। অ্যারাইভালে বেরিয়ে কিছু দূর এগোতেই হঠাৎ ডানদিকে চোখ গেল, দেখলাম তুমি দাঁড়িয়ে আছ। পাঁচ মিনিট দু’জন দু’জনের তাকিয়ে থাকলাম। তুমি কি করে জানলে যে আমি আজ আসছি? আমি তো কাউকে জানাইনি, অতনুরও তোমার খবর রাখার কথা নয়। কোনও কথা বলিনি, অনেক কিছু মনে চলছিল, অন্যমনস্ক হয়েই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে চললাম।  

চার বছর আগে
এয়ার পোর্টের দিকে ট্যাক্সি চলেছে, রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। আমরা দু’জন ট্যাক্সির দুই জানলা দিয়ে একটা শহরের একই রাস্তার দুটো আলাদা ফুটপাথ দেখে চলেছি। কারও মুখে কোনও কথা নেই। দু’জনের মনেই এক রাগমিশ্রিত দুঃখ। রাগ, একে অপরের বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব না বোঝার; দুঃখ, প্রেম নামের বন্ধুত্বের বন্ধু হওয়ার সময় আর নেই, আমরা অবহেলা করে চলেছি আজও ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তোমার পাহ্রী (তখন “প্যারিস” বলতাম) যাওয়াটাকে সেই সময় মেনে নিতে পারিনি। আমিও যাইনি, কেবল সেই ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু তুমি যাবেই, যাও, তবু আজও একটা প্রতিশ্রুতি দিতে পারলে না, শেষ মুহূর্তেও।

ট্যাক্সি থেকে নেমে, তোমাকে শুধু বিদায় জানিয়েই ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম। ঠিক করে কথা বলতে পারিনি। এয়ার পোর্টের ভিড়ে তোমার হারিয়ে যাওয়া অব্দি অপেক্ষা করিনি। ফিরে আসছিলাম, হয়ত এতটা দুঃখ তখনও আর কোনও কিছুতে পাইনি। একটা ম্যাসেজ এলো, তুমি জানালে যে তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো, প্রথমবার। সেই মুহূর্তেই ট্যাক্সি আবার ঘোরালাম এয়ার পোর্টের দিকে, ফিরে এলাম যেখানে তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম, তুমি তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। তার পরের ত্রিশ মিনিট আমি খুব নিবিড়ভাবে তোমার উষ্ণতা বুঝেছিলাম। তুমি চলে গেলে। তুমি আলাদা ছিলে, তুমি চলে যাওয়ার সময় শীতলতা দিয়ে যাওনি।

পাহ্রী পৌঁছে তুমি কেবল দুই মাস আমার সাথে যোগাযোগ রেখেছিলে, তার পর তুমি আর তুমি ছিলে না। কোনও এক অনন্যার খোঁজ করে চলেছি আমি আজও। পাহ্রীর এক ফ্লোরিস্টকে দিয়ে প্রতিবছর জন্মদিনে তোমায় ফুল পাঠিয়েছি, পেয়েছিলে? শেষ বছর থেকে তোমার ঠিকানাটা বদলে গেছে বোধহয়!

আজ
আজকের এই রাতটার কথা অনেক আগেই লিখে রেখেছি। তোমার কথা লেখা নেই এতে, আজকেও তুমি নেই। এই “তুমি” তুমি নও। 


“তোমার সাথে আলাপ বছর তিন আগে;
আলাপ সেই প্রেমের শহরে, এক তারা ভরা রাতে
আজও আশ্চর্য হই, কেন সেদিন মেঘ সরে গেলো?
মধ্যরাতের প্যারিস, খুব শীত বেড়ে গেলো হঠাৎ করে
তুমি চশমা খুলে দিলে, নরম পশম নামিয়ে দিলে গলা থেকে;
শেষ পেগ অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে কখন বুঝতে পারিনি
আজ দুপুর থেকে তোমার চুলের ঘনত্বে হারিয়ে গেছি
জেনেভা থেকে সোজা উড়ে এসেছি, কাজের ওজুহাত সবাই দেয়
প্রেমিক হিসেবে পরিচয় দিতে চাই না, নীল চোখের নীলকণ্ঠ পাখি তুমি
মিথ্যে নয়, সদ্য হারানো প্রেম ভুলতে চেয়েছিলাম শরীরের দাবীতে;
রাত দুটো, দুজন হাঁটতে থাকলাম, তপ্ত আমার ওভারকোট
খালি রাস্তায় তুমি আমার দুই গাল চেপে ধরলে, শীতল হাত;
আমার ওষ্ঠ বন্দী বিশ সেকেন্ড; বললে ক্ষমা করতে
আজ আবার প্রথম চেনা মুখ তুমি, বিশ্বাস করো;
আর ক্ষমা করতে চাই না, তুমি জানো, আমি জানি;
এই তিন বছর কাদের থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছি? তুমি বল
ফিরিয়ে দাও আমাকে সেই রাত; কথা দিলাম, আর এই রাত ফিরবে না”

Tuesday, May 28, 2013

রোধ বিরোধ



(নিম্নোক্ত গল্পটির চরিত্রগুলো কাল্পনিক। গল্পটির সাথে কারও ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা জড়িয়ে থাকলে, তা কাকতালীয়; ইচ্ছাকৃত নয়)
 


“তোমার টিফিন বক্স টেবিলে, ব্যাগে ঢুকিয়ে নাও”, অনিমার রোজকার এক রুটিন, স্বামীর অফিস বেরোনোর আগে টিফিন রেডি করে দেওয়া। তাও তো ছেলে তপুর কলেজের পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে, ওর কলেজ যাওয়া নেই বলে সকালটা অনিমা একটু শান্তিতে কাজ করতে পারে। ছেলে আর স্বামী একসাথে সকালে তাড়া দিতে থাকলে, দম ফেলার উপায় থাকে না অনিমার। যাদবপুর ঝিল রোডের কাছে তিনজনের সংসার। সুখী সংসার বলব কি? ওই, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর সুখী সংসার বলতে যা বোঝায়! 
স্বামী অসীম এক সরকারি অফিসের কর্মচারী। পঁচিশ বছরের কর্মজীবনে খুব যে পদোন্নতি করেছে অসীম, তা নয়। আসলে সবকিছুই কিরকম ঝামেলা মনে হয় অসীমের। অফিসের কাজ, সংসারের দায়িত্ব, সবই কিরকম বোঝা। সবই তবু করছে, কারন করতে হবে, সংসার আছে, ছেলে- বৌ আছে। কেবল যে জিনিসটায় অসীমের কখনও বিরক্তি আসে না, তা হল নিজের মত কবিতা লেখা। অসীমের কোনও কবিতা কোনোদিন কোথাও ছাপেনি, অসীম চেষ্টাও করেনি, ওই, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর সবকিছুতেই কুণ্ঠাবোধ। সবসময়ই মনে হয়েছে, আমার লেখা ভালো নয়; বাড়ির লোক , বন্ধুরা এইসব নিয়ে খিল্লি করতে পারে। যে কাগজগুলোতে অসীম লিখত, তা বাড়িতে এক ট্রাঙ্কে খুব যত্নে লুকিয়ে রেখেছে ও। ট্রাঙ্কের চাবি সবসময় নিজের কাছে রাখে। শেষ কয়েকবছরে অবশ্য একটা সুবিধা হয়েছে, তপু খুব জোর করেই হাতে একটা মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিয়েছে। এখন অফিসের ফাইলে বিরক্তি এলে, মোবাইলে ছোটো ছোটো কথা লেখে অসীম। কাউকে পাঠায় না সেই কথাগুলো, সেভ করে রাখে। কাকে পাঠাবে? কে বুঝবে এই কথাগুলো? যৌবনে পা দেওয়ার পর থেকেই অসীমের খুব ইচ্ছে ছিল,  নিজে নিজের মত সারাটা জীবন কাটাবে, ঘুরে বেড়াবে, লিখবে। কিন্তু, সেই গলায় গামছা দিয়ে বিয়েও করতে হয়েছে, বাচ্চাও তৈরি করেছে, চলছে সবই। কিন্তু আরও তো একটা কারন ছিল নিজের মত থাকার! সেটা কোনোদিন কাউকে জানায়নি অসীম, বলতে পারেনি। শুধু নিজের মধ্যে এক হীনমন্যতা নিয়ে বাস করে, সবাইকে অসীম সুখী করতে পেরেছে তো? কাউকে ঠকায়নি তো? 
বাড়ি থেকে অফিসের জন্য বেরিয়ে রীতিমত ছুটতে হয় অটো ধরার জন্য। প্রতিদিনের মত আজও অটো স্ট্যান্ডে এসে অসীম দেখল এক বিশাল অটোর লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। নাকে হঠাৎ বেশ উগ্র কিন্তু সুন্দর পুরুষালী গন্ধ এলো, অসীম বুঝতে পারল যে লাইনে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি আজ পুরো শিশি গায়ে ঢেলে এসেছে। ছেলেটিকে দেখলে বোঝা যায় সেক্টর পাঁচ এর কোনও অফিসে কাজ করে। অসীম ভাবতে লাগল, তাহলে নিশ্চয়ই অফিসের কোনও সুন্দরী মহিলার দৃষ্টি এবং ঘ্রাণ দুইই আকর্ষণ করার জন্য এই ব্যবস্থা নিয়েছে ছেলেটি। ছেলেটি অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে অনর্গল মোবাইলে একটার পর একটা কল নিতে থাকল। অসীমের শেষমেশ সেই ছেলেটির সাথে একই অটোতে জায়গা হল, সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্যক্রমে, সেটা অসীম আর ওই ছেলেটি কারোরই জানা ছিল না।  ছেলেটির পাশে বসে অসীমের এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। সেই অনুভূতিটা অসীম ঠিক মেলাতে পারছে না কিছুর সাথে কিন্তু বুঝতে পারছে যে এই অনুভূতিটা কোথাও যেন সে ফেলে এসেছিল আজ থেকে বছর পঁচিশ আগে। ছেলেটির পাশে বসে লক্ষ্য করল অসীম, ছেলেটি বেশ সুদর্শন এবং সুঠাম। অটোতে কেউই কোনও কথা বলছিল না। কেবল ছেলেটি চিৎকার করে ফোনে কাউকে নিজের মোবাইল নাম্বারটা দিচ্ছিল। অসীম শুধু ছেলেটির কথোপকথন শুনছিল, দৃষ্টি সামনের দিকে। ছেলেটি কিছুক্ষণ পরেই অটো থেকে নেমে যায়। অসীম অটোতে কিরকম একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে রইল। নিজের স্টপেজে নামতে ভুলে গেলো, এক স্টপেজ আগে গিয়ে নামল সে।
অফিসে সেই লেটে পৌঁছানো, টেবিলে ফাইলের ভিড়, সবই সবার সয়ে গেছে। আজ সত্যি কাজে মন নেই অসীমের, ফাইলের গন্ধে যেন এখনও ছেলেটার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে অসীম। সকাল এগারোটার চা এর পরেও কাজে মন বসছে না। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করল সে, তাতে লিখল,
“পাঠিয়েছিলে গ্রীবার ঘ্রাণ,
আমার আঙুল তোমার পাঁজর গুনতে চেয়েছিল”


বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধ্যে সাতটা। পথে একবার মদের দোকানে প্রায় প্রতিদিন দাঁড়াতে হয় অসীমকে, একটা কোয়াটার সস্তার হুইস্কি কিনে বাড়ি ফেরে সে। বাড়িতে সত্যি যে খুব ফেরার টান থাকে অসীমের, তা নয়। যৌবন নেই, এমন নয় যে বিছানার টান পড়ে আছে বাড়িতে। অনিমার জন্য মন কেমন করে? না, তাও নয়। তবে, নিজের ছেলেকে বেশিক্ষণ না দেখে থাকতে পারে না অসীম। সংসারে যদি আজও সে টিকে আছে, তা কেবল তপুর জন্য। বাড়ি ফিরে, গা ধুয়ে, মদ নিয়ে বসার আগেই সে তপুর সাথে একটু কথাবার্তা বলে নেয়, বাবা ছেলে সারাদিনের কর্মকাণ্ডের আলোচনা সেরে নেয়।  অনিমার সাথে প্রয়োজন ছাড়া সত্যি আজকাল আর বেশী কথা হয় না অসীমের। দুজনেই বুঝে নিয়েছে যে তাদের বাকি জীবনটা একসাথে থেকেও রেলের দুই লাইনের মত সমান্তরাল রয়ে যাবে। মদের সাথে সময়টা অসীম একাই কাটায়, বাড়ির কেউ তখন আর ওই ঘরে ঢোকে না। 
আজ দুই পেগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যখন নেশাটা একটু বেশ লেগেছে মনে হল অসীমের, নিজের মোবাইলটার দিকে হাত বাড়াল সে। ড্রাফ্‌ট খুলে দেখতে লাগল বারবার, আজ দুপুরে লেখা ওই দুটো লাইনকে, খুঁজতে লাগল আবার গন্ধটাকে। 
নেশার ঘোরে বিড়বিড় করে বেশ কয়েকবার অসীম আওড়ে ফেলে নাম্বারটা, অটোতে ছেলেটির মুখ থেকে শোনা। কিছু না ভেবেই, দুপুরে লেখা লাইন দুটো পাঠিয়ে দেয় ওই নাম্বারে।
রাত বারোটা বেজে গেছে। চারদিক খুব শান্ত।  অসীম শুতে গেলো।
রাত দুটো, অসীমের মোবাইলে এক ম্যাসেজ আসে।
পরের দিন সকালে বেশ তাড়াহুড়োর মধ্যে অফিস বেরোতে হয় অসীমকে। ফোনটা নিতে ভুলে যাচ্ছিল, অনিমা মনে করিয়ে দেয়। অফিস পৌঁছে জানতে পারে যে একটা ফাইল বড়বাবু খুব জলদি চেয়েছেন, তাই সেই ফাইলটা শেষ করতে লেগে যায় সে। বারোটা নাগাদ তপুর একটা ফোন আসে মোবাইলে, তার ক্রিকেটের নতুন জুতো লাগবে। একটা হালকা হাসি হেসে “হ্যাঁ” বলে মোবাইলটা কেটে দেয় অসীম আর তখনই লক্ষ্য করে একটা ম্যাসেজ এসেছে। খুলে দেখে, তাতে লেখা রয়েছে, “লাইন দুটো বেশ, আরও কিছু শুনতে চাই।” অচেনা নাম্বার। হঠাৎ অসীমের মনে পড়ে গেলো, গতরাতের সব ঘটনা। কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে রইল সে, বুঝতে পারছে না ঠিক কি হল। 
সারা শরীরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করল অসীম, বেশ ভালো লাগছে আজ অসীমের সবকিছু, এমনকি অফিসের ফাইলগুলো। আজ অসীম খুশি খুব, কেন তা সে নিজেও ভালো করে জানে না।  
বাড়ি ফেরার পথে আজ চাইনিস কিনে নিয়ে যাবে সে, অনিমাকে রাতে রান্না করতে না করে দিল অসীম।


এক মাস পরে—
অসীম এখন লেট করে অফিস যায় না, অফিসের ফাইলগুলোকে আর ঘেন্না করে না। রাতে বাড়ি ফিরে মদ খায় না। ঠিক সময়ে  রাতের খাবার খেয়ে শুতে চলে যায় বাইরের ঘরে। অনিমার সাথে অসীম শেষ দুই বছর ধরে আর এক বিছানায় শোয় না। বাইরের ঘরে শুতে যাওয়ার মুহূর্তটার জন্য অসীম রোজ অপেক্ষা করে থাকে। এরপর অসীমের ম্যাসেজ আদানপ্রদান শুরু হয় সেই ছেলেটির সাথে, প্রতিদিন রাতে। 
ছেলেটির নাম শিশির, বয়স ত্রিশ, অবিবাহিত। শিশির ওর এক অফিসের মহিলা কলিগের সাথে প্রেম করে, নাম সুতপা এবং ওরা দুইজন একসাথে থাকে চিংড়িহাটার কাছে। এই কথা অসীম জানে। 
অসীম আর শিশির দুইজন কোনোদিন দেখা করেনি, দেখা করার কথা ওঠেওনি। এমনকি, ম্যাসেজের বাইরে কোনোদিন ফোনে দুজনের গলার আওয়াজও শোনেনি। ওরা দুইজন দুইজনকে ভালোবাসে বা প্রেম করে, এটা ঠিক বলা যায় না। তবে, দুইজন দুইজনের খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে।  সামনাসামনি বসে একে অপরকে হয়ত অনেক কথাই বলা হয়ে ওঠে না যা একে অপরের অবর্তমানে বলতে পারে। অসীম কিন্তু কোনোদিন শিশিরকে জানায়নি যে সে কিভাবে শিশিরকে চিনল। অসীম শিশিরের কাছে কিছুই লুকায় না, কেন অসীমের নিজের যৌনতা নিয়ে সংশয় থাকা সত্ত্বেও বিয়ে করে, ওর সাথে অনিমার সম্পর্কের কথা, অসীম নিজের ছেলে তপুকে কতখানি ভালবাসে ইত্যাদি। শিশিরও নিজের সম্পর্কে কিছুই লুকায়নি। কেবল, ওদের দুইজনের বাড়ির কেউই জানে না এই সম্পর্কের কথা। শিশির অসীমের লেখার খুব ভক্ত হয়ে ওঠে, ওর মনে হয় যে একজন মানুষ যদি ওর সাথে প্রতিদিন দুই দণ্ড কথা বলে সুখী থাকতে পারে, তবে এই সম্পর্ককে সকলের অগচরে টিকিয়ে রাখার মধ্যে কোনও অন্যায় নেই।
এভাবেই চলতে থাকে, অসীমের জীবন, শিশিরের জীবন।


প্রায় এক বছর পরে-
অফিস থেকে এসে অসীম স্নান সারতে গেছে। বাইরে অসম্ভব বাজে গরম। টেবিলের ওপর মোবাইলটা অনর্গল বেজেই চলেছে। অফিসের কুণ্ডুবাবু ফোন করে চলেছেন। অনেকবার বাজার পর, তপু এসে ফোনটা ধরে। কুণ্ডুবাবু জানান যে ওনার স্ত্রীকে হাসপাতাল নিয়ে যেতে হচ্ছে, রুবিতে, যদি অসীম একবার আসতে পারে। তপু বাবাকে জানাবে বলে রাখতে গিয়ে দেখে, একটা অচেনা নাম্বার থেকে ম্যাসেজ, “আজ রাতে সুতপার সাথে বাইরে ডিনারে যাব, কাল কথা হবে।”একজন বিশ বছরের ছেলের এরকম ম্যাসেজ দেখে যে কৌতূহল হয়, তপুরও তাই হল। ও ফোনের ইনবক্স খুলে দেখল, শুধু ওই নাম্বার থেকেই ম্যাসেজ, ম্যাসেজ গুলো তেমন কোনও প্রেমের বার্তালাপ নয়। তবে, সেন্ট আইটেম এ গিয়ে অসীমের পাঠানো ম্যাসেজগুলো দেখে তপু নির্বাক হয়ে যায়। সে পরিষ্কার বুঝতে পারে, অসীমের জীবনে কি চলছে। 
হঠাৎ, অসীম স্নানঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তপু জানায়, কুণ্ডুবাবুর ফোনের কথা এবং অসীমের দিকে এক অব্যক্ত দৃষ্টি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।


আরও এক বছর পর-
অনিমা এখন এক মানসিক হাসপাতালে থাকে। প্রায় আট মাস আগে তপু একদিন হঠাৎ বাড়ি থেকে চলে যায়, অনিমাকে সে কোনোদিন জানায়নি অসীমের কথা, শুধু জানিয়ে গেছে যে তার আর অসীমের সাথে এক ছাদের নীচে থাকা সম্ভব নয়। তপু অসীমের ড্রয়ারে একটা কাগজ রেখে গেছিল, তাতে শুধু লিখে গিয়েছিল, “তোমার, আমার মাকে ঠকানো ঠিক হয়নি। ফোন নাম্বার রইল, কোনোদিন ফোন করার চেষ্টা করবে না।” এই চিঠির কথা অসীম কোনোদিন অনিমাকে বলেনি।  সংসারে স্বামী থেকেও তার আদর থেকে চিরকাল বঞ্চিত হয়েছে অনিমা। কেবল মুখ বুঝে ছেলে মানুষ করে গেছে। সেই ছেলেকেই যখন অনিমা নিজের কাছে পেল না, যন্ত্রণা সয়ে সয়ে আজ তার আশ্রয় মানসিক রোগীদের সাথে।  অসীম অনেকবার তপুকে ফোন করে জানাতে চেয়েছে অনিমার কথা, কিন্তু ফোন বেজে গেছে, তপু ফোন ধরেনি।
অসীমের এই সাংসারিক অবস্থার কথা যেদিন শিশির জানতে পারে,  আর পারেনি ওদের সম্পর্কের কথা সুতপার কাছে লুকোতে। সুতপাও মেনে নেয়নি এই সম্পর্ককে। শিশির এখন একাই থাকে।
কিন্তু, এখন অসীম আর শিশিরের মধ্যে কোনও যোগাযোগ নেই।

দুপুরেই ম্যাসেজটা পেয়েছিল তপু, অসীমের নাম্বার থেকে, লেখা আছে শুধু, “আমি চললাম, মাকে দেখিস।” তখন থেকেই ওর মাথায় কি যেন একটা চলছে, অসীমকে ও কোনোদিনই মাফ করবে না, অসীমের ও মুখও দেখতে চায় না। কিন্তু এরকম ম্যাসেজ! 
রাত ১০ টা নাগাদ, তপু প্রায় এক বছর পর বাড়িতে ফেরে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। প্রায় এক ঘণ্টা কোনও সাড়া না পেয়ে দরজার লক ভাঙ্গে। তপু এতক্ষনে বুঝে গেছে, ভেতরে কি হয়ে গেছে। ভেতরের শোওয়ার ঘরের পাখা থেকে অসীম গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। টেবিলে ট্রাঙ্কের চাবি আর একটা কাগজে লেখা, “তপু, তোর জন্য অনেক গল্প রেখে গেলাম। ট্রাঙ্কটা খুলে দেখিস।”


আরও দুই বছর পর-
একটা শপিং মলে এক বইয়ের দোকানে শিশির বই দেখছিল। হঠাৎ একটা বইয়ের দিকে ওর নজর গেলো, সদ্য প্রকাশিত বই,  
তপেন্দু দত্তের, “আমার বাবা”


(অটোতে, এক যুবকের সাথে, এক প্রৌঢ় সমকামী মানুষের সাক্ষাতের ঘটনাটি সত্যি। ঘটনাটি শুনে একসময় ভেবেছিলাম, এর ওপর সিনেমা বানালে কেমন হয়! তখনই একটা গল্পের খসড়া বানিয়ে রেখেছিলাম। সেটিই প্রকাশিত করলাম, সিনেমাটা আর হল না)
    

Friday, December 21, 2012

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যে হয়



না না, কোনও বাঘ নিয়ে এই লেখা নয়। বরং যাকে নিয়ে এই লেখা, নাড়ু, আমার স্কুলের বন্ধু, সে নিতান্তই চুপ চাপ ছেলে ছিল স্কুলে। তবে কলেজের গণ্ডী পেরানোর  আগেই নাড়ুর অনেক উন্নতি ঘটেছিল, গুরুজনেরা যাকে বলেন লেজ গজানো বা পিছন পেকে যাওয়া। আমার, আগে থেকেই পাকা ছিল। বন্ধুর ভালো নামটি বললাম না। সবেমাত্র দুই সপ্তাহ আগে বিয়ে করেছে। যা লিখতে চলেছি, তা যদি ওর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী দেখে, সামনের মাসে তালাক দিয়ে দিতে পারে। 

তখন ব্যাচেলর্স ডিগ্রী পেরিয়ে মাস্টার্সে ঢুকেছি সবে। নাড়ু তখনও ডাক্তারি পড়ছে।  নাড়ুর বাড়িটি ছিল আদর্শ মদ খাওয়ার ঠেক, সপ্তাহের মধ্যে যদি কলেজ না যেতে হত। অনেক সময় আমরা প্ল্যান করে দু’জনেই কলেজ বাঙ্ক করে ওর বাড়িতে বসে মদ্যপান করতাম। নাড়ুর মা ছিলেন একটি স্কুলের হেড মিস্ট্রেস আর ওর বাবাও অফিসে বেরিয়ে যেতেন অনেক সকালে। সকাল ১০ টায় নাড়ুর মা স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেই নাড়ু চলে যেত মদ কিনতে। আমিও বাড়ি থেকে রওনা দিতাম। আর আমাদের মদ খাওয়ার পাট বিকেল ৪ টের মধ্যে শেষ করতে হত কারন তার পরেই কাকিমা স্কুল থেকে ফিরতেন। তখন মদ বলতে সবচেয়ে সস্তা হুইস্কি। কোনও কোনোদিন এরকমও হয়েছে, আমরা সবে মদ্যপান করে নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরচ্ছি আর কাকিমাও তখন ঢুকছেন। কাকিমা হেসে জিগ্যেস করছেন, “কেমন আছ?” আর আমিও ঢুলুঢুলু চোখে বেশী বেসামাল হওয়ার আগেই কাকিমার পায়ে পড়ে প্রনাম করতাম। আর নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের ঠেক ছিল গঙ্গার ঘাট।
  
এরকমই একদিন, নাড়ুর বাড়িতে মদ্যপান করতে করতে, সে বেচারা মুখ ফুটে বলেই ফেলল যে সদ্য প্রেমে পড়েছে। আলোচনা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো যে বোতল শেষ হতে হতে নাড়ু ঠিক করেই নিল, আমাকে সেদিনই ওর সেই হবু শ্বশুরবাড়ি দেখাবে আর ওই অবস্থাতেই দেখাবে। আমিও উস্কে দিয়ে বললাম, “চল, শালা।“  নাড়ুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে, স্টেশনে এসে, লোকাল ট্রেনে বিনা টিকিটে দুটি স্টেশন পেরিয়ে এলাম নাড়ুর হবু শ্বশুরবাড়ি দেখতে।  ট্রেন থেকে নেমে হাঁটছি তো হাঁটছিই। ওই লোকালয়টি আমার খুব পরিচিত ছিল না, কিন্তু স্কুল জীবন থেকে বন্ধুদের বিশেষ আলোচনায় অংশগ্রহণ করে জেনেছিলাম যে ওর কাছাকাছি একটি বেশ্যাপল্লী আছে। আমি বিষয়টি নিয়ে নাড়ুকে জিগ্যেসও করলাম কিন্তু নাড়ু “লা লা ( না না, মাতাল অবস্থার উচ্চারণ) “ বলে কাটিয়ে দিল। প্রায় এক ঘণ্টা ওই অবস্থায় ঘোরার  পরও নিজের হবু শ্বশুরবাড়ি না পেয়ে, তিতিবিরক্ত হয়ে, নাড়ু বলল, “চল, ফিরে যাই।“ আমি তো মনে মনে হাসছিও আবার এরকম হাঁটানোর জন্য ওকে উদুম খিস্তিও মারছি। 

নাড়ু পথিকৃৎ, শর্ট রাস্তায় স্টেশন নিয়ে যাবে; চল। একটা রাস্তা থেকে এক গলির ভেতর দিয়ে চলা শুরু করলাম। গলির সামনে দেখি দেশী মদের ঠেক, লোকজন ছোলা সেদ্দ দিয়ে টানছে। নাড়ু আমার থেকে প্রায় দশ হাত আগে হাঁটছে। গলির দুই দিকে ছোটো ছোটো খুপরির মত টালির বাড়ি। সন্ধ্যে ঘনিয়ে গেছে, হালকা বাল্বের আলোয় রাস্তায় সব বুঝতে পারছি না, তার ওপর টেনে রয়েছি। সামনে, হঠাৎ হালকা আলোতে দেখতে পেলাম, নাড়ুর ওপর দুই দিক থেকে দুই জন বয়স্কা মহিলা ঝাঁপিয়ে পড়ে বলছে, “ এই, এদিকে এসো না গো”, “আচ্ছা বল, কত?”, এই সব উক্তি। মুহূর্তের মধ্যে বুঝলাম, ভুল জায়গায় ঢুকে পড়েছি; নেশা সব এক নিমেসে শেষ। কে নাড়ু? আমি তো ঘুরে দৌড়; জীবনে এত জোরে কোনোদিন ছুটিনি। অনেকটা দূর আসার পর লোকজনকে জিগ্যেস করে করে স্টেশন এ পৌঁছাই। আমার পরে পরে নাড়ুও হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে উপস্থিত। আমি কোনও জীবিকা বা কাউকে ছোটো করছি না কিন্তু আমাদের জীবনে বেশ্যাগৃহের সামনে পৌঁছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রথমবার ছিল। যথারীতি, ক্যাবলা বাঙালী ছেলেদের একটু বুক ধুরপুর তো করেই।

এরপর অনেক বছর কেটে গেছে।

শেষ মাসে, নাড়ুর ফোন। বলল, বিয়ে করছে, যেন অবশই আসি। জিগ্যেস করলাম,” তোর শ্বশুরবাড়ি কোথায়?” যে জায়গাটি বলল, সেখানেই আমরা দুই মাতাল প্রায় ছয় বছর আগে ওর তখনকার হবু শ্বশুরবাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম।