Friday, September 21, 2012

বোধি, শেষ দৃশ্য, আমাদের সিনেমাগুলো



আমি অতি বাজে ধরনের মাথা মোটা লোক। বই পড়ে কোনও কিছু বুঝতে আমার বেশ সময় লাগে। Algorithm এ LIFO FIFO , ভিড় বাসে চড়ার আগে কোনোদিন ঠিক ঠাক বুঝতে পারিনি। তবে কোনও জিনিস দেখে, যেমন সিনেমা বা আশে  পাশে যা হচ্ছে, আমি সহজে অনেক কিছু নিতে পারি। আমি সিনেমা নিয়ে দাঁড়ি চুলকে আঁতলামো মারা সেই সব বিদগ্ধ কোকিলাহারী ( বঙ্কিমচন্দ্রের “বাবু” ) নই। সিনেমা জিনিসটা ছোটো থেকেই খুব ভালোবাসি (অনেকটা তোতোর মত)। আর Star  Movies এর থেকে Hallmark এ সিনেমা দেখতেই বেশি পছন্দ করতাম। তবে, আমি সব দেখি, শুক্রবারের মসালা হিন্দি সিনেমা থেকে দেব, European , hollywood থেকে অনুরাগ। আর সব থেকে বেশি উপভোগ করি সিনেমা নিয়ে আড্ডা, আলোচনা; আঁতলামো নয়। আমার খুব কম সংখ্যক বন্ধু বান্ধবের মধ্যে বেশীর ভাগ লোকই ভাল সিনেমা দেখে, তা নিয়ে আলোচনা করতে ভালবাসে। আর কখনও  কোনও বাইরের লোক সেই আড্ডার মাঝে আঁতলামো মারতে এলে, আমরা অতি সাবধানে যত্ন সহকারে তার কাছা খুলে হাতে ধরিয়ে দেই। এই লেখার পরের অংশ অন্য দিকে মোড় নেবে।

শেষ রাতে, বেশ গভীর রাতেই,  এক বন্ধুর নেমন্ত্রনে এক রেস্তোরায় হাজির হলাম। অনেক দিন পর দেখা। দুই বন্ধুই অতি উৎফুল্ল। একটু না হলে তো নয়। বসা হল একটু পানীয় নিয়ে। বন্ধু, সাথে তার আরেক বন্ধুকে নিয়ে এসেছে, নাম বোধি। আলাপ পরিচয় হল, কথা বার্তা শুরু হল। আমাকে দাদা বলে সম্বোধন করে কথা বলা শুরু করল, বয়সে ছোটই হবে। প্রায় দু ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, আড্ডা চলছে। আমার এই বন্ধুটির সিনেমা বিষয়ক জ্ঞান ভয়ঙ্কর, আলোচনাও করে না সেই সব নিয়ে। কথার ছলে, কোনোভাবে আড্ডায় সিনেমা চলে আসে, আর তা নিয়ে নিজ দায়িত্বে কথা বলা শুরু করে স্বয়ং বোধি। বোধির সিনেমার বিষয়ে অগাধ জ্ঞান দেখে আমি চমকে যাই, অত্যন্ত খুশিও হই। আর কিছু European সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে করতে, আমরা শেষে ঈশ্বরে চলে যাই। হ্যাঁ, অবশ্যই এই বিশাল range এর আলোচনার জন্য পেটের পানীয়ও অনেকটা দায়ী।

বোধিকে জিজ্ঞেস করলাম, ভগবানে বিশ্বাস নেই কেন? বোধি বলল, “ তোমাকে কয়েকটা দৃশ্য বলছি। ধরে নাও একটা সিনেমার অংশ।” আমি উৎসাহ নিয়ে শোনা শুরু করলাম।

\\\ একজন ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র, তৃতীয় বর্ষের। রোজকার মত সেদিনও সকালে মা ভাত ডাল ভাজা তাড়াতাড়ি করে রান্না করে দিয়েছেন। কোনোমতে খেয়ে সকালে ক্লাস করতে চলে গেছে।

একটা সরকারি অফিস। ছেলেটির বাবা সেখানে চাকরি করেন। রোজকার মত লাঞ্চ টাইমে ঘরে স্ত্রীকে একবার ফোন করলেন। কেউ ফোন ধরল না; দুবার, তিনবার, না, কোনও উত্তর নেই। আর দুবার চেষ্টা করে ভদ্রলোক বাড়ির দিকে রওনা হলেন তাড়াহুড়ো করে।

বেলা চারটে নাগাদ, ক্লাস শেষে ছেলেটি বন্ধুদের সাথে কলেজে আড্ডা মারছে। মোবাইলে বাবা ফোন করে খুব ধীর গলায় ছেলেকে বাড়ি চলে আসতে বললেন।

ছেলে বাড়ি এসে দেখল, মা মারা গেছেন। হঠাৎ করে, cerebral attack.  সকালেও মা সুস্থ ছিলেন।

রাতে মায়ের মরদেহ নিয়ে শ্মশানের দিকে যাত্রা করার সময় ছেলেটি দেখল, খাওয়ার টেবিলে রাতের খাবার ঢাকা দিয়ে রাখা আছে। ///

আমি বোধির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম, তারপর চোখ নামিয়ে নিলাম।

Friday, August 31, 2012

বেনফিস এ বই!


তখন ক্লাস নাইনে পড়ি, খুব সম্ভবত। স্কুলে একজন নতুন ইংরেজির শিক্ষক এলেন। অল্পবয়স্ক, বেশ জিম করা পেটানো চেহারা; উনি নাকি ক্যারাটে ব্ল্যাক বেল্ট ছিলেন; খুবই ভদ্রলোক; বেশ ভালই পড়াতেন; নাম ঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত অরূপ।  ওনার চেহারা দেখে আমরা ছাত্ররা বেশ ভয়ে ভয়ে থাকতাম, ক্লাসে কোনও গণ্ডগোল না।

তখন কোলকাতা বই মেলা সবে শেষ হয়েছে। আমি সেই বছর বইমেলায় যাইনি। একদিন ক্লাসে অরূপ স্যার পড়া শুরু করার আগে জিজ্ঞেস করলেন, কে কে এবারের বইমেলায় গেছে? ক্লাসে যা হয়, সবাই হঠাৎ করে নিজেকে পুস্তকপ্রেমী প্রমাণ করতে চায়; অনেকেই হাত তুলল। তাদের বেশীর ভাগই সেইবারের বইমেলায় যায়নি।

এই না যাওয়া কিন্তু হাত তোলা ছেলেদের দলে, একজন ছিল রুদ্র। পুরো নাম মনে নেই। আর আমার সাথে স্কুল জীবনে বেশী কথাবার্তাও হোতো না। ওর একটু কথার উচ্চারণ করতে অসুবিধা হত, যা নিয়ে ক্লাসের ছাত্ররা ওকে অনুকরণ করে মজা নিত; খুবই বাজে অভ্যাস কিন্তু একটা বয়সে স্কুল জীবনে এগুলো হয়ে থাকে; সুখ স্মৃতি হিসেবেই রয়ে যায়।

তো, রুদ্র হাত তোলায়, রুদ্রকে অরূপ স্যার দাঁড় করান, জিজ্ঞেস করেন কোন স্টল থেকে কি বই কিনেছে। রুদ্র পড়ল ফাঁপরে! পাশ থেকে একটি অত্যুৎসাহী, বন্ধুর শুভচিন্তক ছেলে ফিস ফিস করে বলে, “ বল, বেনফিস থেকে বই কিনেছি।“ রুদ্র বন্ধুর ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে স্যারের কাছে প্রকাশ করল ওর পুস্তকপ্রেম।

স্যার রীতিমত আঁতকে উঠলেন, “বেনফিস এ বই!” আমার এখনও স্যারের মুখের এক্সপ্রেশন মনে আছে। আর তারপর মনে আছে, যে উত্তম মধ্যম কেলানি রুদ্র খেয়েছিল স্যারের কাছ থেকে মিথ্যে বলার জন্য। বেচারা রুদ্র!

হারানদা, চলে গেলে?


এই মানুষটিকে আমি শেষ দেখেছি বছর বারো আগে। আজও যখন মনে করতে চাই, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা খাটো ধুতি পরা, কৃষ্ণবর্ণ, মধ্যবয়স্ক, ছোটোখাটো চেহারার মানুষ। বাম হাতে সবসময় একটা ঘড়ি আর বৈষ্ণব। হারানদা, হারান নাপিত, সবাই যা বলে ডাকত। হারানদা ছিল আমাদের স্কুলের নাপিত! বিষয়টা পরিষ্কার করে দেই।

সকাল  ১০ টা থেকে সাড়ে ১০ টার মধ্যে যখন স্কুলের মেন গেট দিয়ে ছাত্ররা প্রবেশ করত, আমাদের প্রধান শিক্ষক মহাশয় স্কুলে প্রবেশের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এর একটাই কারন ছিল। ছাত্রদের চুল এবং নখ ছোটো করে কাটা নাকি তা পর্যবেক্ষণ করা। আর প্রধান শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত হারানদা। কোনও ছাত্রের চুল আর নখ বড় থাকলে, তাকে সোজা তুলে দেওয়া হোতো হারানদার হাতে। চুল ছোটো করে তবেই স্কুলে প্রবেশ। আমাকে যদিও কোনদিন হারানদার হাতে পড়তে হয়নি, তবু লোকটিকে আমার বেশ লাগত।

আজও আমার চুলের উচ্চতা দেড় ইঞ্চির বেশী কখনই যায় না। অনেকটা বলতে পারেন, যাকে আমরা বলি, বাটি ছাট (লালুর মত নয়)।  স্কুলের আবেশ রয়ে গেছে।

এর বাইরে আমি হারানদা কে দেখেছি, আমাদের স্কুলের মাঠের কোনায় কদম গাছের  তলায় বসে বিড়ি খেতে আর নিজ মনে রাধাকৃষ্ণের ভক্তিগীতি গাইতে। এছাড়া আমি তাকে আর চিনতাম না। কয়েকদিন আগে, এক স্কুলের সহপাঠীর সাথে পুরানো স্কুলের স্মৃতিচারণ হচ্ছিল। তখন কথায় কথায় জানলাম, হারানদা মারা গেছে। এই লেখাটা ছাড়া, হারানদা কে বাঁচিয়ে রাখার আর উপায় দেখলাম না।

Monday, July 30, 2012

সবাইকেই হারিয়ে যেতে হয়


যারা আমাকে টুইটারে অনুসরন করেন, যারা এই পোস্ট পড়ছেন কিমবা যারা আমাকে একটু ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন, তারা বেশ ভালো করেই জানেন যে আমি মদ্যপান করতে ভালোবাসি। আমি মাতাল নই কিমবা নেশাগ্রস্ত সেইসব ফুটো আঁতেল নই যারা লোকের সামনে কালো চশমা পরে বাজে বকে। সত্যি বলতে, জীবনে কতবার মাতাল হয়েছি সেটা হাতে গুনে বলা যায়। কিন্তু সপ্তাহে দুই একদিন বারে বসে মদ্যপান আমি খুব উপভোগ করি। তবে কোনোদিন যদি সম্ভব হয়, একটা বই লিখব সেইসব অগণিত চরিত্রগুলোর ওপর, যাদের সাথে আলাপ ওই টেবিলের ওপাশে বা কাউণটারে।
তিন মাস আগের কথা। এক শুক্রবার সন্ধ্যায় গিয়ে বসলাম নিজের পরিচিত পাব এ। হুইস্কি অর্ডার করলাম, অন দা রক্স। কিন্তু বরফের ওপর হুইস্কি ঢালা আমার খুব একটা পোশায় না। তাই ওয়েটার সবসময় আগে হুইস্কি ঢেলে তার ওপর দুটো বরফের টুকরো ছেড়ে দেয় আমার পেগ এ। সেদিন দেখলাম একটি নতুন ছেলে, সে আমার পেগ সম্পর্কে জানেনা বলে তাকে বুঝিয়ে দিতে হল। কিন্তু বরফ ছাড়ার আগে দেখলাম তার হাত কাঁপছে। জিজ্ঞাসা করলাম হিন্দিতে, “ এই লাইনে নতুন নাকি?”। ছেলেটি খুব লাজুক বিনয়ী ভাবে হেসে বলল, “হ্যাঁ।” ছেলেটির দিকে তাকালাম, দেখলাম বেশ চোখে মুখে একটা ব্রাইট ভাব আছে। নাম জিজ্ঞাসা করতে জানাল, ওর নাম বিভাস, বালেশ্বরের ছেলে। আমার থেকে বছর ছয় ছোটো হবে।
একমাস পর আবার যখন ওই পাব এ যাই, আমার পেগ বেশ সুন্দর করে বিভাস নিজে হাতেই তৈরি করে দেয়। আমি খুব স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞাসা করি কি করা হত এর আগে।  জানলাম সবে বি এস সি শেষ করেছে ফিসিক্সে; বোম্বেতে কোনও চাকরির কোচিং সেন্টারে পড়ছে আর পাব এ কাজ করছে। ভালো লাগল দেখে, এরাই জীবনের সত্যি কারের বিজয়ী। আমার নিজের মনে হল যে ওর জন্য কিছু কাজ দেখি, যা করছে তার থেকে কিছু একটা ভালো। আমি একজনের সাথে কথা বলে রেখেছিলাম ওর একটা কাজের ব্যপারে, ল্যাব সংক্রান্ত একটা কাজ, আপাতত ছয় মাসের জন্য।  
প্রায় এক মাসের ওপর ওই পাব এ যাওয়া হয়নি। শেষ এক সপ্তাহ শহরের বাইরে ছিলাম। কাল শহরে ফিরেছি। সফরের ক্লান্তি কাটাতে কাল রাতে ওই পাব এ গেলাম আর মনে মনে ঠিক করে গিয়েছিলাম যে বিভাসকে অফারটা দেব। কিন্তু গিয়ে দেখলাম বিভাস নেই। অন্য আরেকজন কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করতে সে জানাল বিভাস বোম্বে ছেড়ে চলে গেছে। কেন, কোথায় কেউ ই জানে না। 
ঘটনাটি খুবই সামান্য হয়ত। তাই না?
আমি কোনও মহান লোক নই বা নিজেকে মহান বলে প্রমান ও  করতে চাইনা।  তবে নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী চেষ্টা করি কারও যোগ্য প্রাপ্য তাকে দিতে।
সবাইকেই হারিয়ে যেতে হয়। বিভাসের মত লড়াকু লোকদের জন্য না হয় একটা ছোটো পোস্টই লিখলাম।

Thursday, June 28, 2012

From My Old Pocket Diary

"Wild Strawberries"


"8 1/2" , not of Fellini's
 


 ন্যাকামো 







"Naam to suna hoga"




Sunday, April 22, 2012

“হ্যাঁ রে, পটল কত করে?”


আর সকলের মত আমারও স্কুল জীবনের স্মৃতি বড়ই মধুর। জীবনে অনেক কিছুই স্কুল থেকে শিখেছি, অনেক বড় মাপের ব্যাক্তিত্বদের সান্নিধ্যে এসেছি, তাদের স্নেহ পেয়েছি, প্রয়োজনে তিরস্কৃতও হয়েছি। কিন্তু আজ যে মানুষটির স্মৃতিচারণ করব, এনার সাথে স্কুলের কোনও সুখস্মৃতি নেই। শুধু আমার কেন, আশা করি আমার কোনও সহপাঠীরও ছিল না, থাকা সম্ভব নয়। ওনার আসল নামটা এখানে গোপন রাখলাম; নামের উচ্চারনের সাথে মিল রেখে ওনাকে “আর্তনাদ বাবু” বলেই ডাকি। ওনাকে কোনদিনই ভুলব না; নবম এবং দশম শ্রেণীতে অতিরিক্ত বিষয় পদার্থবিদ্যা পড়াতে গিয়ে উনি আমাদের যেরূপ অপদার্থ হিসেবে পেয়েছিলেন, তারই কিছু টুকরো স্মৃতি এখানে তুলে ধরছি।

     আর্তনাদ বাবুর কথা বলার একটি বিশেষ পদ্ধতি ছিল, সেটি পদার্থবিদ্যার কোন নিয়ম মেনে চলে আমি আজ অব্দি আবিষ্কার করতে পারি নি। ওনার কথা বলা শুরু হত “হ্যাঁ রে” উচ্চারনের সাথে এবং এটি বলার সময় উনি একটি বিশেষ উপায়ে ওনার অঙ্গুলিটি আমাদের দিকে তাক করে দিতেন। আমার বাল্যবন্ধু দিবাকর প্রতিদিন ওনার ক্লাসে কথা বলত, এর ওর সাথে ফসটামি- নষ্টামি করত। প্রতিদিন আর্তনাদ বাবু ওকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “হ্যাঁ রে, কোথা থেকে আসা হয়?”। দিবাকর প্রতিদিন বলত, “স্যার, সোদপুর।“। স্যার বলতেন, “আর আসতে হবে না।“ [দিবাকর এখন সুখী সংসারী লোক। ওর স্ত্রীয়ের মত সুন্দরী মহিলা আমি কমই দেখেছি। ভাগ্যবান]।

     এই প্রতিদিনের নাটক আরও জমে উঠত, যদি কেউ বলত, “স্যার, একটু বাথরুম যাব।“। আর্তনাদ অমায়িকভাবে বলত, “বাথরুম যাবি? তো যা”। ছেলেটি সামনের দরজা দিয়ে বাথরুমের জন্য বেরিয়ে যখন দ্বিতীয় দরজা অতিক্রম করত করিডর দিয়ে, স্যার ক্লাস থেকে ডাক দিতেন, “হ্যাঁ রে, শোন”। ছেলেটি করিডর থেকে বলত, “কি স্যার?”। আর্তনাদ বলত, “হ্যাঁ রে, ওখানেই কানটি ধরে বসে পর।“ কিছু বলার নেই।

     নবম শ্রেণীর প্রথম সারির ছাত্রদের পদার্থবিদ্যার একটি প্রবলেম করাতে গিয়ে উনি একদিন একটু মানে ইয়ে, নিজেই প্রবলেম এ পড়ে গেছিলেন। ছেলেগুলোও ছিলাম আমরা বাজে ভাষায় যাকে বলে ,”গাছ হারামি।” চিত্তরঞ্জন দাসগুপ্তর পদার্থবিদ্যার বই মাধ্যমিক স্তরের জন্য যথেষ্ট কিন্তু আর্তনাদকে একটু ঘোরানোর জন্য উচ্চমাধ্যমিক স্তরের হ্যালিডে বা ভারমার বই থেকে প্রবলেম বেছে বেছে আনতাম। তো, অনেক ভেবে, বোর্ডের ওপর অনেক ছবি এঁকেও যখন আর্তনাদ প্রবলেমটি করতে পারলেন না, আমাকে বললেন যে দশম শ্রেণীর ফাস্ট বয়কে ডেকে আনতে। আমিও গেলুম, দাদাকে বললুম কেসটি কি। দাদা এলে, আর্তনাদ তাকে বলল, “হ্যাঁ রে, দেখি প্রবলেম টা করতে পারিস নাকি!”। দাদা একটু সময় নিয়ে বোর্ডে প্রবলেমটি সঠিকভাবে করে চলে গেল। এরপর আর্তনাদ একটি কথাই বলেছিল, “হ্যাঁ রে” না বলে, “দেখ, একেই বলে ফাস্ট বয়।”

     কথায় বলে, “যেমন বাপ, তার তেমন ছেলে।“ কথাটি আর্তনাদ আর ওঁর আজব দুনিয়ার বেধপ ছেলের ক্ষেত্রে ১০০% খাঁটি ছিল। অদ্ভুত ছেলে। আমাদের থেকে এক শ্রেণী নীচে পড়ত। যে রাগ আমরা ছাত্ররা ওর বাবার ওপর ফলাতে পারতাম না, তা স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের মাঠে ওর ওপর ঝাড়তাম। কারন অকারনে ল্যাঙ, ঘুষি চলতেই থাকত। একদিন ছেলেটিকে আমাদের সহপাঠী রাহুল বেশ ভালো কেলিয়েছে যাকে বলে, ফুটবল খেলার সময়। সে বেচারা, আর না পেরে টিচারস( তখন মানে অন্য ছিল, এখন উচ্চারন করলে আরেক জিনিস দেখি) রুমে ওর বাবার কাছে নালিশ করতে গেছে। আর্তনাদ বেরিয়ে এলেন, দেখলেন ছেলে কাঁদছে, ওকে জিজ্ঞেস করলেন বারবার, “হ্যাঁ রে, কি হয়েছে? কি হয়েছে?”। কিন্তু ছেলের তো হয়ে গেছে, ছেলে আর নালিশ করবে কি! রুম থেকে একটু দূরে রাহুল দাঁড়িয়ে আর্তনাদের ছেলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে দৃষ্টিশক্তি দিয়েই হূল ফোটাতে থাকল শুধু। আর নালিশ করতে পারল না বেচারা। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় নাকি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আর্তনাদের ছেলে (আরও উঁচু স্তরের বৈজ্ঞানিক, বাবাকেও ছাড়িয়ে গেছে) বাড়িতে বিছানার চাদরে আগুন লাগিয়ে বলেছিল, “বাবা, বাবা, দেখ হাইড্রোজেন জ্বলছে!”। আর্তনাদ তখন “হ্যাঁ রে” বলে কি উত্তর দিয়েছিলেন, জানা নেই।

     এই “হ্যাঁ রে” এর কবল থেকে শুনেছি বাজারের সবজিওয়ালারাও বাদ যায়নি। উনি সবজির দোকানে গিয়েও বলতেন , “হ্যাঁ রে, পটল কত করে?” কয়েকবছর আগে উনি স্কুলের বিজ্ঞানবিভাগের প্রধান হয়ে অবসর নিয়েছেন। আশা করি, স্কুলে এখন সব শান্ত আছে, আর ছেলেদের প্রস্রাব চেপে করিডরে কান ধরে বসতে হয় না।