Thursday, February 9, 2012

“আফ্রিকা” আর কোপাই

স্কুল জীবন থেকেই একটু খ্যাপাটে ছিল সৌম্য; এমনিতে চুপচাপ, ক্লাসে শেষ বেঞ্চে বসত, কারও সাতে পাঁচে নেই, নিজের মত থাকত। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতেও পারে, নাও পারে, ওর মুডের ওপর। ইতিহাস ক্লাসে কোনোদিন পড়া পারত না, রোজ রেগুলারিটি বুকে বাড়িতে চিঠি যেত। বাবা-মা কে দিয়ে সেই চিঠি সই করাতো না, কে জানে, কে সই করে দিত। টিফিনে খেলতে যেত না কোনোদিন। আমার সাথে সৌম্যর বন্ধুত্ব অনেক পরে, ক্লাস সেভেনে, সেটাও হয়েছিল অদ্ভুত ভাবে। 

স্কুলে আবৃতি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছি সাহস করে। বাংলা স্যারের মাথায় কি ভূত চেপেছিল কে জানে, রবীন্দ্রনাথের “আফ্রিকা” আবৃতি করতে হবে। হে ভগবান, আমার যে আর কিছুতেই মুখস্ত হয় না। সুকুমার রায়ের কবিতা খুব সহজে মুখস্ত করে পাড়ার বিজয়া সম্মিলনীতে ছোটো থেকে বলে আসছি, এখন “আফ্রিকা”? স্কুলের হলে যখন প্রতিযোগিতা শুরু হল, প্রতিযোগীরা সব একত্রিত হয়ে ব্যাক স্টেজে বসে। দেখি সৌম্য, আমার তো চক্ষু ছানাবড়া! সূর্য কোনদিকে উঠেছে ভাই?  সৌম্য কবিতা বলবে? ভরসা পেলাম, আর যাই হোক, সৌম্যর থেকে আমি অন্তত ভালো বলব। প্রতিযোগিতা শেষ হল, ফল ঘোষণা হল, “আফ্রিকা” বলে প্রথম হয়েছে সৌম্য; একটু গলাটা ঝেড়ে কেশে বলি, আমি হয়েছিলাম দ্বিতীয়, অনেক বড় বড় হনুমানের থেকে ভালোই বলেছিলাম। এখন “আফ্রিকা” মনে নেই, প্রায় ভুলেই গেছি। 
অনুষ্ঠানের পর, অনেক মুড নিয়ে আমাকে সৌম্য বলেছিল, “তোকে কবিতার মুডটা আরও ভালো করে ধরতে হত।“ লে পচা! সেদিন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব শুরু। অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা, কিন্তু যে স্থান আর ঘটনাগুলি আজ মনে পড়ছে, তা সংক্ষেপে বলি।
*                                                       *                                                                *

সবে স্কুল জীবন শেষ হয়েছে, ২০০২ সাল। অনেক বড় হয়ে গেছি। ধোঁয়া টানতে শিখেছি, পানীয় সেবনেও হাতে খড়ি হয়ে গেছে, বোতল দেখলেই ছুক ছুক করে, প্রথম প্রেম করছি সে সময়, যদিও হাতে মোবাইল নেই, ফোন বুথ ভরসা। স্কুলের তিন মার্কামারা বন্ধু- আমি, সৌম্য আর রাহুল ঠিক করলাম, এবারের ২৫ শে ডিসেম্বর বোলপুরে কাটাব। যেমন প্ল্যান, আর কোনও কিছু না ভেবে ২৪ তারিখ তিন দিনের মত জামাকাপড় গুছিয়ে হাওড়া থেকে বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যাসেঞ্জারে চেপে সোজা বোলপুর। 

ট্রেনে উঠে দেখি, রাহুলের চেহারায় একটা বেশ ঝিলিক দিচ্ছে। রোগা পাটকাঠির মত চেহারা, টোকা দিলে পড়ে যাবে, ওরকম মিচকি মিচকি হাসছে কেন? সৌম্য আমাকে ফিসফিস করে বলল, “শালার বাঁ হাতের আঙুলের আংটি টা দেখ!”। ওমা! কলির কেষ্ট যে! “হ্যাঁ রে রাহুল, আংটির কেস টা কি?”
-“নবনিতা (আস্ত মাথামোটা) দিয়েছে” ,রাহুলের মুখে সে কি হাসি! মোনালিসাও লজ্জা পেয়ে যাবে।
- “সোনার রিং নাকি!”
-“না, জল করা”
-“নবনিতার এত টাকা আসছে কোথা থেকে?”
-“সে তো ওর বাপ বুঝবে, তোর কি”
-“ও ও ও”, চুপ হয়ে গেলাম, বেশি ঘাঁটালাম না। 

বোলপুর পৌঁছে লজ খুঁজতে অসুবিধা হল না। ওইটাই স্টেশন চত্বরে সব থেকে সস্তার লজ ছিল বোধহয়। আর তো উপায় নেই। সবাই তো বাবার হোটেলে খাচ্ছি তখন। নামটাও মনে আছে, “অদ্বৈত লজ”। প্রতিদিন ডবল বেড রুমের ভাড়া ৬০ টাকা।
ওইদিন বিকেলটা শান্তিনিকেতনের ভেতর “নন্দন” এর সামনে কিছুক্ষণ বসে আর লেডিস হোস্টেলের সামনের মাঠে সন্ধ্যে পর্যন্ত বসে আড্ডা মেরে কেটে গেলো। তখনও শান্তিনিকেতনের ভেতর অবাধে ইচ্ছে মত ঘোরা যেত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল তখনও অক্ষত, চুরি যায়নি। 

রাতে লজে এক বোতল “রাজকীয় নীল” খোলা হল। কি করব ভাই? গরীবের হুইস্কি! তখন পয়সা কোথায়? এখন আমি ওর গন্ধও সহ্য করতে পারব না, বয়স হচ্ছে তো! মদ্যপান ছাড়া বোলপুরে গিয়ে লোকে আর যেসব কুকীর্তি করে, আমরা তা করিনি, আমরা ভদ্র ছেলে!  

পরের দিন সকালে উঠে চিন্তায় পড়ে গেলাম, কি করব সারাদিন। লজের সামনের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে চাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, “আপনারা ‘আমার কুটীর’ ঘুরে আসেন না কেন? বাস স্ট্যান্ডে চলে যান, জিজ্ঞেস করুন, বাসে ১০-১৫ মিনিট। ঘুরে আসুন।“ চল, ঘুরে আসাই যাক। বাসে উঠতে যাব, সৌম্যর কি খেয়াল হল, বলল “আমি বাসের ছাদে চললাম।“। আর কি! বন্ধুকে সাহচর্য দিতে, আমরাও ছাদে। 

অনেকেই হয়ত জানেন, “আমার কুটীর” একটা হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমাদের মনে হল শুধু দেখা ছাড়া তো আর কিছু করার নেই। সৌম্য হঠাৎ উধাও। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলে, “চল, সারাদিন আড্ডা দেওয়ার একটা মোক্ষম জায়গা পেয়েছি।“ বলে আমাদের  “আমার কুটীর” এর পিছনে নিয়ে গেল, দেখলাম একটা সরু নদী, নাম কোপাই, মাঝ নদীতে হয়ত কোমর পর্যন্ত জল। কিছু গ্রামবাসী নদীর ধার দিয়ে কাদা মাটি থেকে গুগলি শামুক ধরছে। জায়গাটি এমনিতে দৃশ্যত খুব সুন্দর নয়, কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। তিনজনে সিগারেট জ্বালিয়ে বসে গেলাম। দুপুর গড়াতেই কি খেয়াল হল, যে ওই কাদামাটিতে কোপাই এর জলে স্নান করব, উৎসাহ সব থেকে বেশি সৌম্যর। আমি তো একটু কিন্তু কিন্তু করছি। জিন্স পরেই ঝাঁপ দিতে হল কোপাইতে। ওটি আমার খুব সখের একটি নিউপোর্ট ব্লু জিন্স ছিল। 


স্নান করতে গিয়ে সে এক কাণ্ড! রাহুলের আঙুল থেকে আংটিটি জলে পড়ে গেছে। ছেড়েছে! নবনিতা তো রাহুলকে খুন করে দেবে। বন্ধুকে নিয়ে যতই ঠাট্টা করি, ওর অবস্থা দেখে সত্যি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। দেবদূত বলে যদি কিছু থাকে, সেদিন দেখেছিলাম। বললে বিশ্বাস করবেন না, একজন কাদামাটি থেকে গুগলি খুঁজে বের করছিল, সে রাহুলের আংটির কথা শুনে নিজেই প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে খোঁজার পর কাদা থেকে উদ্ধার করেছিল আংটিটিকে। ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আর কিছু দেওয়ার ক্ষমতা তখন আমাদের ছিল না। অন্য কিছু দিলে হয়ত তাকে অপমান করা হত। নবনিতা আর রাহুলের সম্পর্ক আরও দেড় বছর টিকেছিল।

ভেজা জিন্স, টি শার্ট পড়েই কোপাইয়ের তীরে বসে রইলাম। আমরা গল্প কমই করলাম, চুপ করেই বেশি সময় কাটালাম। একটু দূরের এক পাড়ার দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট বিস্কুট কিনে আনা হল। বিকেল গড়িয়ে গোধূলি। কোপাই ছাড়িয়ে দূরের আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, আমরা তখনও বসে আছি। সৌম্য প্রায় পাঁচ বছর পর আবৃতি করল, “আফ্রিকা”। যখন প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে, আমরা রওনা দিলাম বোলপুরের দিকে। ওই দিনটা আজও আমি ভুলিনি। ভেবেছিলাম, বাকিরা ভুলে গেছে, হয়ত আমি ভুল ছিলাম।
*                                                       *                                                                *
এপ্রিল, ২০০৫ সাল। আমার কিছু ব্যক্তিগত ব্যপারে সৌম্যর অহেতুক নাক গলানোর ফলে, কিছু জিনিস খুব বাজে ভাবে কেঁচিয়ে যায়। আজ জিনিসগুলো খুব সামান্য মনে হলেও, আমি আজও মনে করি, দোষটা সৌম্যরই ছিল। আমাদের বন্ধুত্ব মোটামুটি ওই বছরেই পুরো শেষ হয়ে যায়। কেউ কারও কোনও খোঁজ রাখিনি, কোনোভাবে।  
*                                                       *                                                                *
এপ্রিল, ২০০৮ সাল। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কলকাতা শাখার একজন ছাত্র সদস্য হিসেবে আমি এবং আরেকজন বন্ধু বোলপুরে সেই সংস্থার একটি শাখার উদ্বোধনে আমন্ত্রিত হই। মনে আছে, প্রচুর বাজে জ্ঞান দিয়েছিলাম সেইদিন, সারাদিন ধরে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বিশ্বভারতীর গেস্ট হাউসে। ওনাদের কাছে আবদার করে আরও একটি দিন বেশি থাকার অনুমতি নিয়ে নিলাম। পরের দিন সকালে বন্ধুটি বলে যে সারাদিন কি করা যায়? বললাম ওকে যে বিকেলে একটি জায়গায় নিয়ে যাব। বিকেলে উপস্থিত হলাম সেই জায়গায়, কোপাইয়ের তীরে। এক ঘণ্টা বসে থাকার পর কি হল জানি না, মনে হল সৌম্যর সাথে কথা বলি। লাগালাম, ওর পুরনো হাচের নাম্বারটা (আমি নাম্বারটা সেদিন পর্যন্ত ডিলিট করিনি)। ওদিক থেকে আওয়াজ এলো
-“হ্যালো”
-“হ্যালো, সৌম্য আছে?”
-“দাদা তো দিল্লীতে থাকে। আমি ওর ভাই বলছি“
-“ওর নাম্বারটা পাওয়া যাবে কি? আমি ওর স্কুলের বন্ধু বলছিলাম”
-“দাদা আমাদের সাথেই প্রায় যোগাযোগ রাখে না। আর কাউকে নাম্বার দিতে ও  না করেছে, সরি।“
-“ঠিক আছে। রাখছি”

রাহুল ততদিনে আমেরিকা চলে গেছে। মনে পড়ল, সত্যিই তো, সৌম্য কোনোদিন ওর বাড়িতে নিয়ে যায়নি আমাদের, বাড়ির লোকদের কোনও কথাও বলেনি কোনোদিন। স্কুলেও কখনও দেখিনি ওর বাবা বা মাকে। জানিনা। 

সেটাই আমার শেষবারের মত কোপাইয়ের তীরে যাওয়া, এখনও পর্যন্ত। রাতে গেস্ট হাউসে ফিরে নাম্বারটা ডিলিট করে দিলাম।
*                                                       *                                                                *
গতকাল রাতে একটু তাড়াতাড়ি শুতে যাচ্ছি, সকালের ফ্লাইট। ঘুমটা প্রায় এসেছে, রাত ১ টা। একটা ফোন এলো।
-“হ্যালো”
-“কেমন আছিস?”, একটা ভারী গলা।
-“কে?”
-“সৌম্য বলছি।“
আমি তো হতবাক। কোনও খোঁজ নেই, পাত্তা নেই, হঠাৎ করে আজ, কি ব্যপার?

-“মার্চ সেকেন্ড উইক বম্বে যাচ্ছি। এক সপ্তাহের জন্য। থাকার ব্যবস্থা করে রাখিস। সব ডিটেল এই নাম্বারে মেসেজ করে দিচ্ছি। রাখলাম”, বলে ফোন কেটে দিল।

মালটা, আজও খ্যাপাটে। মার্চ সেকেন্ড উইক তাহলে!


Wednesday, February 8, 2012

ঘেটো ও ছাঁকনি

২০০৫ সাল। আমার এক বন্ধু অজয় এর নিমন্ত্রনে কলকাতার উপকণ্ঠে এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে উপস্থিত হলাম হোলির দিনে, সকাল সকাল। অজয় অনেক করে বলেছে; ওর নাকি অনেক সুন্দর সুন্দর গোপিনী জুটেছে এখানে, তাদের সাথে আলাপ করিয়ে দেবে। হোলি খেলারও সুযোগ জুটবে নাকি সেই মহিলাদের সাথে, তাই আর বন্ধুকে না করতে পারিনি; আর সদ্য সেই সময় ক্ষত থেকে উঠেছি। খুব বেশি সকালেই উপস্থিত হলাম, দরজায় লাথি মেরে অজয়ের ঘুম ভাঙাতে হল। ঘর তো নয়, একটা জলজ্যান্ত সিগারেটের শ্মশান, বেঁচে আছে কি করে? অজয়ের ঘরে বসবাসকারী অন্য জীবটি তখনও অদ্ভুত ভাবে  মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছে, ওর নাম গৌরব, শোওয়া দেখলেই বোঝা যায় কিসের স্বপ্ন দেখছে। অজয় বলল কাল একটু বেশি টেনেছে গৌরব, চিন্তা নেই, একদম লাঞ্চের আগে উঠবে। দুই বন্ধু বেরিয়ে গেলাম, সামনে মাসীর দোকানে চা আর সিগারেট নিয়ে বসলাম। একটু পরে আরেকটি প্রাণীর সাথে সেখানে আলাপ, নাম সানি। গল্প চলছে।

     হঠাৎ করে সানি অজয়কে জিজ্ঞেস করল, রাতের সব প্ল্যান ঠিকঠাক কিনা। অজয় জানাল আমাদের চিন্তা করার কোনও কারন নেই, গুরুদেব একা নিজের দায়িত্বে সব করে দেবে বলেছে। ভীষণ কৌতুহল নিয়ে সুখটান দিতে লাগলাম। কিই বা প্ল্যান আর কেই বা সে গুরুদেব! 

     যাই হোক, সকাল ১১ টা থেকে রঙ খেলা শুরু হল। কিন্তু সেই গুরুদেবকে দেখতে পেলাম না। রমণীদের সাথে কলেজ জীবনে সেইটাই আমার শেষবারের মত হোলি খেলা। একজন খুবই সুন্দরী, অজয়ের এক বান্ধবীকে সেদিন সামান্তা ফক্স নাম দিয়েছিলাম। সামান্তার সাথে সেদিনের পর আর দেখা হয়নি। ২০১০ সালে চেন্নাইতে একদিন হঠাৎ সামান্তার সাথে দেখা হয়েছিল, ১০ মিনিটের জন্য। সামান্তা সেখানেই একটি কোম্পানিতে এখন চাকরি করছে। কিছু স্মৃতি  নিজের মধ্যে থেকে গেলেই মধুর।

     হোলি খেলার পর দুপুরে খিদে আর ঘুম দুটোই জবরদস্ত গতিতে তেড়ে আসে। পেট পুরে খেয়ে বিকেল ৪ টের সময় ঘুমের মধ্যে ডুবে গেলাম বন্ধুর ঘরে; কখন সন্ধ্যে গড়িয়ে ৭ টা বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি। অজয়ও ঘুমিয়ে চলেছে। হঠাৎ করে ঘরের বাইরে থেকে তারস্বরে বাংলায় অতীব শ্রুতিমধুর কিছু শব্দ দরজাকে ভেদ করে ঢুকে আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিলো। যে ভদ্রলোক বাইরে থেকে চিৎকার করে আমাদের জন্য এত সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যয় করছেন, তার আসল উদ্দেশ্য হল আমাদের ঘুম থেকে তোলা এবং রাতের সেই প্ল্যানে আমাদের কাজে লাগানো। "এই রে ঘেটো!", বলেই অজয় তিড়িং করে  উঠে ঘরের দরজা খুলে দিলো। দেখলাম একজন মানুষ প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, ৪৬ কোমর, প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাক বডি, ঢোলা পায়জামা, হাতে বিড়ি নিয়ে কাঁচা বাংলায় অজয়কে খিস্তি মারতে মারতে ঘরে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই আদেশ, "যা, তলার মেস থেকে তিনটে বড় গামলা নিয়ে আয়। না বললে আমার নাম নিবি। বাকি সব রেডি। গৌরব আর সানিকে ডেকে নে।" অজয় চলে গেলো। বুঝলাম ইনিই সেই গুরুদেব। আলাপ করলাম। ঘেটোর আসল নামটা উল্লেখ করলাম না। ওর বাড়ি ঘাটালে বলে ওকে সবাই ওই নামে ডাকে। দেখে প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু এরকম দিল খোলা মানুষ আমি জীবনে কমই দেখেছি।

     সবাই একত্রিত হলাম ঘেটোর ঘরে। আমি, অজয়, সানি, গৌরব আর ঘরের মালিক। তিনটে গামলা রেডি। এবার দেখলাম ব্যাগের ভেতর থেকে কি কি বেরোচ্ছে। পুরো ঘাবড়ে গেলাম। জীবনে কোনোদিন ভাঙ বা সিদ্ধি কোনটাই খাই নি। শুনলাম ঘেটো নাকি পুরো ব্রহ্মাণ্ড দেখাবে বলে ৩০০ গ্রাম সিদ্ধির সাথে ৩০০ গ্রাম ভাঙের গুলি মিক্স করে এনেছে। গুরুদেব নিজ হাতে সেই মিক্সচার প্রায় ১০ প্যাকেট আমুল টেটরা প্যাকডের সাথে গামলায় গুলতে লাগলেন। এরপর, তার মধ্যে দু ডজন কলা, কাজু, কিসমিস, বাদাম বাটা, ৭৫০ গ্রাম রসগোল্লার রস, আরও ৫০০ গ্রাম চিনি, কালো আঙুর মেশালেন, শেষে ওনার আঙুলের তামার আংটিটি বেশ ভালো করে ঘষে দিলেন। যে মনোযোগের সাথে যত্ন নিয়ে উনি এই পানীয় তৈরি করছিলেন, স্বয়ং সঞ্জীব  কাপুরও লজ্জা পেয়ে যেত।

     অবশেষে পানীয় সেবনের উপযুক্ত হল। আমরা সবাই নিজ নিজ গ্লাস বাড়িয়ে দিলাম। ঘেটো সবার গ্লাসের ওপর একটি ছাঁকনি রেখে, ছেঁকে ছেঁকে আমাদের পানীয় দিতে লাগল এবং নিজেও তৃপ্তির সাথে পান করতে লাগল। আমিও "জয় বজরং বলি" বলে প্রায় ৭-৮ গ্লাস সেবন করেই নিলাম। যখন সবার পান প্রায় শেষ, তিনটে গামলা পুরো খালি, যে যে ঘটনা গুলি ঘটেছিল, তা নীচে বর্ণনা করছি-

- যখন সবার শেষ গ্লাস চলছে, তখন সবাই বুঝছে যে কিছু একটা হচ্ছে। কিন্তু সবাই সবার দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করছে যেন সে নিজে পাঁচ অক্ষরের চালাক, বাকি সবাই চার অক্ষরের বোকা।

- খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না ভেবে, আমি উঠে অজয়ের ঘরে চলে এলাম। ভাবলাম শুয়ে পড়ি। একটি টি শার্ট আর বারমুডা পরে শুয়ে পরলাম। শোয়ার পরে আমার প্রথম চিন্তা, আমি কোন দিকে মাথা দিয়ে শোব। যাই হোক, একটি চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে থাকলাম।
- কিছুক্ষণ পরে ভাবলাম যে যদি একটু স্নান করে নেই, তাহলে হয়ত আর অস্বস্তি লাগবে না। জামা কাপড় না ছেড়ে, গামছা না নিয়েই স্নানে গেলাম রাত ১১ টায়।

- ওদিকে, যে ঘরে খাওয়া হচ্ছিল, অজয় সেই ঘরের মেঝেতে আর গৌরব খাটে লুটিয়ে পড়ে ঘুমিয়ে গেছে। সানি খেলা দেখাচ্ছে। সানি ঘেটোকে বলল, "আমার শুয়ে পড়লে কষ্ট হচ্ছে।" ঘেটো, "তাহলে বসে থাক।" সানি, "আমার বসে থাকলেও কষ্ট হচ্ছে।" ঘেটো, "তাহলে তুই মাঝামাঝি থাক।" শুনেছিলাম পরে, ওই গোটা রাত সানি একটা অদ্ভুত ভাবে না শুয়ে, না বসে বিছানায় এলিয়ে রেখেছিল নিজেকে।

- সানিকে সেই বিচিত্র আসনে বসিয়ে ঘেটো গোটা হোস্টেল ঘুরতে বের হয়।

- এদিকে আমি বাথরুমে, স্নান করতে গেছি। যেই বাথরুমের দরজা লাগাতে গেলাম, মনে হল, ছিটকিনি লাগানো ঠিক হবে নাকি, যদি আমার ভেতরে কিছু হয়ে যায়, লোকে তো আমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু দরজা খোলা রেখে স্নান করলে লোকে কি ভাববে! তাই দরজায় ছিটকিনি না দিয়ে, দরজাটি ভেজিয়ে আমি পোশাক না ছেড়েই সাওয়ারের তলায় প্রায় ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। 

- বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা ঘরে, গা দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, অন্য ঘরের ছেলেরা তাকিয়ে আছে। হ্যাঁ, ঘরে গিয়ে ভেজা জামাকাপড় ছাড়লাম। তারপর শুতে গেলাম।
- ১০ মিনিট শোয়ার পরেই, মনে হতে লাগল, আমি একটা অন্ধ গুহার মধ্যে দিয়ে প্রায় আলোর বেগে ছুটে চলেছি আর ছুটে চলেছি। হঠাৎ করে আমি চিৎকার করতে লাগলাম, "আমি আর যাব না। আমাকে ফিরিয়ে আন, ফিরিয়ে আন। ও সেলুকাস, আমাকে ফিরিয়ে আন।"। এই চিৎকারে আশে পাশের ঘর থেকে ছেলেরা ছুটে আসে। আমাকে সান্তনা দিতে থাকে। আমি নাকি তখন রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছি। 

- এইসব গণ্ডগোল শুনে ঘেটো কোথায় ছিল কে জানে, ঘরে উপস্থিত হল আর আমাকে জিজ্ঞেস করল, "কি হয়েছেটা কি?" আর তখন আমি  ঘেটোকে দেখে যে অট্টহাসি শুরু করেছিলাম, তা সকাল ৬ টা অব্দি থামেনি।

     আমার কান্নার পরেই এই হাসিটার কারন হল, ছাঁকনি। আমাদের চার জনের অবস্থা খুবই করুন মনে হতে পারে আপনাদের, কিন্তু আপনারা ঘেটোর অবস্থাটা ভাবুন। ঘেটো পান করার পর ৪ ঘণ্টা সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু হাতের থেকে ছাঁকনিটা ছাড়েনি। 

     তারপরের ৩ টে দিন জীবন থেকে মুছে গেছে। ওই ৩ দিন সব কাজই করেছি, কিন্তু একটা ঘোরের মধ্যে, কিছুই মনে নেই। নমস্কার! আর না! ওটাই আমার জীবনে প্রথম এবং শেষবার ভাঙ খাওয়া। তবে একজন বন্ধু পেয়েছিলাম ওই দিন, ঘেটো।

*        *        *

ঘেটোর সাথে আবার দেখা ২০০৯ সালে, ব্যাঙ্গালোরে; ও একটি  সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করছে তখন। এক সপ্তাহ স্রেফ ছুটি কাটাতে গেছিলাম। তখনও কোমর ৪৬। 
      এখন ঘেটো কলকাতায় অন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করছে। মদ্যপান, ধূম্রপান সব বন্ধ। কোমর শুনেছি ৪০ এর কম। ঘেটো এখন বিবাহিত সংসারী মানুষ।