Wednesday, February 8, 2012

ঘেটো ও ছাঁকনি

২০০৫ সাল। আমার এক বন্ধু অজয় এর নিমন্ত্রনে কলকাতার উপকণ্ঠে এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে উপস্থিত হলাম হোলির দিনে, সকাল সকাল। অজয় অনেক করে বলেছে; ওর নাকি অনেক সুন্দর সুন্দর গোপিনী জুটেছে এখানে, তাদের সাথে আলাপ করিয়ে দেবে। হোলি খেলারও সুযোগ জুটবে নাকি সেই মহিলাদের সাথে, তাই আর বন্ধুকে না করতে পারিনি; আর সদ্য সেই সময় ক্ষত থেকে উঠেছি। খুব বেশি সকালেই উপস্থিত হলাম, দরজায় লাথি মেরে অজয়ের ঘুম ভাঙাতে হল। ঘর তো নয়, একটা জলজ্যান্ত সিগারেটের শ্মশান, বেঁচে আছে কি করে? অজয়ের ঘরে বসবাসকারী অন্য জীবটি তখনও অদ্ভুত ভাবে  মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছে, ওর নাম গৌরব, শোওয়া দেখলেই বোঝা যায় কিসের স্বপ্ন দেখছে। অজয় বলল কাল একটু বেশি টেনেছে গৌরব, চিন্তা নেই, একদম লাঞ্চের আগে উঠবে। দুই বন্ধু বেরিয়ে গেলাম, সামনে মাসীর দোকানে চা আর সিগারেট নিয়ে বসলাম। একটু পরে আরেকটি প্রাণীর সাথে সেখানে আলাপ, নাম সানি। গল্প চলছে।

     হঠাৎ করে সানি অজয়কে জিজ্ঞেস করল, রাতের সব প্ল্যান ঠিকঠাক কিনা। অজয় জানাল আমাদের চিন্তা করার কোনও কারন নেই, গুরুদেব একা নিজের দায়িত্বে সব করে দেবে বলেছে। ভীষণ কৌতুহল নিয়ে সুখটান দিতে লাগলাম। কিই বা প্ল্যান আর কেই বা সে গুরুদেব! 

     যাই হোক, সকাল ১১ টা থেকে রঙ খেলা শুরু হল। কিন্তু সেই গুরুদেবকে দেখতে পেলাম না। রমণীদের সাথে কলেজ জীবনে সেইটাই আমার শেষবারের মত হোলি খেলা। একজন খুবই সুন্দরী, অজয়ের এক বান্ধবীকে সেদিন সামান্তা ফক্স নাম দিয়েছিলাম। সামান্তার সাথে সেদিনের পর আর দেখা হয়নি। ২০১০ সালে চেন্নাইতে একদিন হঠাৎ সামান্তার সাথে দেখা হয়েছিল, ১০ মিনিটের জন্য। সামান্তা সেখানেই একটি কোম্পানিতে এখন চাকরি করছে। কিছু স্মৃতি  নিজের মধ্যে থেকে গেলেই মধুর।

     হোলি খেলার পর দুপুরে খিদে আর ঘুম দুটোই জবরদস্ত গতিতে তেড়ে আসে। পেট পুরে খেয়ে বিকেল ৪ টের সময় ঘুমের মধ্যে ডুবে গেলাম বন্ধুর ঘরে; কখন সন্ধ্যে গড়িয়ে ৭ টা বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি। অজয়ও ঘুমিয়ে চলেছে। হঠাৎ করে ঘরের বাইরে থেকে তারস্বরে বাংলায় অতীব শ্রুতিমধুর কিছু শব্দ দরজাকে ভেদ করে ঢুকে আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিলো। যে ভদ্রলোক বাইরে থেকে চিৎকার করে আমাদের জন্য এত সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যয় করছেন, তার আসল উদ্দেশ্য হল আমাদের ঘুম থেকে তোলা এবং রাতের সেই প্ল্যানে আমাদের কাজে লাগানো। "এই রে ঘেটো!", বলেই অজয় তিড়িং করে  উঠে ঘরের দরজা খুলে দিলো। দেখলাম একজন মানুষ প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, ৪৬ কোমর, প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাক বডি, ঢোলা পায়জামা, হাতে বিড়ি নিয়ে কাঁচা বাংলায় অজয়কে খিস্তি মারতে মারতে ঘরে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই আদেশ, "যা, তলার মেস থেকে তিনটে বড় গামলা নিয়ে আয়। না বললে আমার নাম নিবি। বাকি সব রেডি। গৌরব আর সানিকে ডেকে নে।" অজয় চলে গেলো। বুঝলাম ইনিই সেই গুরুদেব। আলাপ করলাম। ঘেটোর আসল নামটা উল্লেখ করলাম না। ওর বাড়ি ঘাটালে বলে ওকে সবাই ওই নামে ডাকে। দেখে প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু এরকম দিল খোলা মানুষ আমি জীবনে কমই দেখেছি।

     সবাই একত্রিত হলাম ঘেটোর ঘরে। আমি, অজয়, সানি, গৌরব আর ঘরের মালিক। তিনটে গামলা রেডি। এবার দেখলাম ব্যাগের ভেতর থেকে কি কি বেরোচ্ছে। পুরো ঘাবড়ে গেলাম। জীবনে কোনোদিন ভাঙ বা সিদ্ধি কোনটাই খাই নি। শুনলাম ঘেটো নাকি পুরো ব্রহ্মাণ্ড দেখাবে বলে ৩০০ গ্রাম সিদ্ধির সাথে ৩০০ গ্রাম ভাঙের গুলি মিক্স করে এনেছে। গুরুদেব নিজ হাতে সেই মিক্সচার প্রায় ১০ প্যাকেট আমুল টেটরা প্যাকডের সাথে গামলায় গুলতে লাগলেন। এরপর, তার মধ্যে দু ডজন কলা, কাজু, কিসমিস, বাদাম বাটা, ৭৫০ গ্রাম রসগোল্লার রস, আরও ৫০০ গ্রাম চিনি, কালো আঙুর মেশালেন, শেষে ওনার আঙুলের তামার আংটিটি বেশ ভালো করে ঘষে দিলেন। যে মনোযোগের সাথে যত্ন নিয়ে উনি এই পানীয় তৈরি করছিলেন, স্বয়ং সঞ্জীব  কাপুরও লজ্জা পেয়ে যেত।

     অবশেষে পানীয় সেবনের উপযুক্ত হল। আমরা সবাই নিজ নিজ গ্লাস বাড়িয়ে দিলাম। ঘেটো সবার গ্লাসের ওপর একটি ছাঁকনি রেখে, ছেঁকে ছেঁকে আমাদের পানীয় দিতে লাগল এবং নিজেও তৃপ্তির সাথে পান করতে লাগল। আমিও "জয় বজরং বলি" বলে প্রায় ৭-৮ গ্লাস সেবন করেই নিলাম। যখন সবার পান প্রায় শেষ, তিনটে গামলা পুরো খালি, যে যে ঘটনা গুলি ঘটেছিল, তা নীচে বর্ণনা করছি-

- যখন সবার শেষ গ্লাস চলছে, তখন সবাই বুঝছে যে কিছু একটা হচ্ছে। কিন্তু সবাই সবার দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করছে যেন সে নিজে পাঁচ অক্ষরের চালাক, বাকি সবাই চার অক্ষরের বোকা।

- খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না ভেবে, আমি উঠে অজয়ের ঘরে চলে এলাম। ভাবলাম শুয়ে পড়ি। একটি টি শার্ট আর বারমুডা পরে শুয়ে পরলাম। শোয়ার পরে আমার প্রথম চিন্তা, আমি কোন দিকে মাথা দিয়ে শোব। যাই হোক, একটি চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে থাকলাম।
- কিছুক্ষণ পরে ভাবলাম যে যদি একটু স্নান করে নেই, তাহলে হয়ত আর অস্বস্তি লাগবে না। জামা কাপড় না ছেড়ে, গামছা না নিয়েই স্নানে গেলাম রাত ১১ টায়।

- ওদিকে, যে ঘরে খাওয়া হচ্ছিল, অজয় সেই ঘরের মেঝেতে আর গৌরব খাটে লুটিয়ে পড়ে ঘুমিয়ে গেছে। সানি খেলা দেখাচ্ছে। সানি ঘেটোকে বলল, "আমার শুয়ে পড়লে কষ্ট হচ্ছে।" ঘেটো, "তাহলে বসে থাক।" সানি, "আমার বসে থাকলেও কষ্ট হচ্ছে।" ঘেটো, "তাহলে তুই মাঝামাঝি থাক।" শুনেছিলাম পরে, ওই গোটা রাত সানি একটা অদ্ভুত ভাবে না শুয়ে, না বসে বিছানায় এলিয়ে রেখেছিল নিজেকে।

- সানিকে সেই বিচিত্র আসনে বসিয়ে ঘেটো গোটা হোস্টেল ঘুরতে বের হয়।

- এদিকে আমি বাথরুমে, স্নান করতে গেছি। যেই বাথরুমের দরজা লাগাতে গেলাম, মনে হল, ছিটকিনি লাগানো ঠিক হবে নাকি, যদি আমার ভেতরে কিছু হয়ে যায়, লোকে তো আমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু দরজা খোলা রেখে স্নান করলে লোকে কি ভাববে! তাই দরজায় ছিটকিনি না দিয়ে, দরজাটি ভেজিয়ে আমি পোশাক না ছেড়েই সাওয়ারের তলায় প্রায় ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। 

- বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা ঘরে, গা দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, অন্য ঘরের ছেলেরা তাকিয়ে আছে। হ্যাঁ, ঘরে গিয়ে ভেজা জামাকাপড় ছাড়লাম। তারপর শুতে গেলাম।
- ১০ মিনিট শোয়ার পরেই, মনে হতে লাগল, আমি একটা অন্ধ গুহার মধ্যে দিয়ে প্রায় আলোর বেগে ছুটে চলেছি আর ছুটে চলেছি। হঠাৎ করে আমি চিৎকার করতে লাগলাম, "আমি আর যাব না। আমাকে ফিরিয়ে আন, ফিরিয়ে আন। ও সেলুকাস, আমাকে ফিরিয়ে আন।"। এই চিৎকারে আশে পাশের ঘর থেকে ছেলেরা ছুটে আসে। আমাকে সান্তনা দিতে থাকে। আমি নাকি তখন রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছি। 

- এইসব গণ্ডগোল শুনে ঘেটো কোথায় ছিল কে জানে, ঘরে উপস্থিত হল আর আমাকে জিজ্ঞেস করল, "কি হয়েছেটা কি?" আর তখন আমি  ঘেটোকে দেখে যে অট্টহাসি শুরু করেছিলাম, তা সকাল ৬ টা অব্দি থামেনি।

     আমার কান্নার পরেই এই হাসিটার কারন হল, ছাঁকনি। আমাদের চার জনের অবস্থা খুবই করুন মনে হতে পারে আপনাদের, কিন্তু আপনারা ঘেটোর অবস্থাটা ভাবুন। ঘেটো পান করার পর ৪ ঘণ্টা সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু হাতের থেকে ছাঁকনিটা ছাড়েনি। 

     তারপরের ৩ টে দিন জীবন থেকে মুছে গেছে। ওই ৩ দিন সব কাজই করেছি, কিন্তু একটা ঘোরের মধ্যে, কিছুই মনে নেই। নমস্কার! আর না! ওটাই আমার জীবনে প্রথম এবং শেষবার ভাঙ খাওয়া। তবে একজন বন্ধু পেয়েছিলাম ওই দিন, ঘেটো।

*        *        *

ঘেটোর সাথে আবার দেখা ২০০৯ সালে, ব্যাঙ্গালোরে; ও একটি  সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করছে তখন। এক সপ্তাহ স্রেফ ছুটি কাটাতে গেছিলাম। তখনও কোমর ৪৬। 
      এখন ঘেটো কলকাতায় অন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করছে। মদ্যপান, ধূম্রপান সব বন্ধ। কোমর শুনেছি ৪০ এর কম। ঘেটো এখন বিবাহিত সংসারী মানুষ।   

Tuesday, January 31, 2012

কেউ উত্তর দিতে পারেনি

তাড়াতাড়ি  করে সিগারেটটা শেষ করে ক্যাফের ভেতর ঢুকে এলো। আজ এত বড় একটা ডিসিশন নেওয়ার দিন। আজ পাশে নয়, দুজনের মুখোমুখি বসা প্রয়োজন। ব্যাগটা নিজের পাশের চেয়ারে রেখে দিল, সামনের চেয়ারটা ফাঁকা। ভাবতে অবাক লাগছিল, আজই কি এই ড্রিমস ক্যাফেতে শেষবার বসবে, জীবনে প্রথমবার দেশ ছাড়ার আগে? সেই ড্রিমস ক্যাফে, পার্ক স্ট্রিট আর কিদোয়াই রোডের জাঙ্কসনে এই ক্যাফেতেই কত বিকেলবেলায় দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে কাটিয়েছে। সময়গুলো কত সহজে নিজের মত কেটে গেছে, কত জটিল সময়ের সব না বলা কথাগুলো দুজনে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে এই ক্যাফেতে। তবে ভাবতে পারেনি, এটাই এই ক্যাফেতে শেষ বারের মত আসা, কোনদিন চাইলেও ফিরে আসতে পারবে না এখানে; দৈবের বশে নয়, সেই, জেদের বশে।

           অলরেডি  সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। একটা ফোন করবে কি? কোথায়? কত দেরী? না, আজ থাক। আজ নিজেকে একটু স্বার্থপর মনে হচ্ছিল। কিছুই তো করতে পারেনি  ওর জন্য, শুধু ঘরের বাইরের সব মন খারাপ করা তিক্ততার পর ওর কাছে বারবার ছুটে এসেছে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। অবশেষে ও এসে পৌঁছল, মাথা নীচু, কিছু কথা বলতে পারল না।  দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে কাটাল, যেন আজ এতদিনের পর কারোরই আর কিছু বলার নেই, সব গল্প আর ঘটনাগুলো নিজের কাছে গুজব মনে হতে থাকল। পর্বতপ্রমান অভিমানের পাথরের চাঁই ভাঙার দায়িত্বটা হয়ত পুরুষদের জন্যই সৃষ্ট।

- আজ ভিসা অ্যাপলাই করার চিঠিটা এসে গেছে। দেখা করার দরকার ছিল। তোমার মতামত জানা প্রয়োজন।

- আমি কে?

             ওর এরকম গলার আওয়াজ সম্পূর্ণ অচেনা। এর কোনও উত্তর জানা নেই। প্রশ্নটা আরও  জটিল হয়ে উঠল-

- আমি তোমার কে?

             আরও এক ঘণ্টা কেটে গেলো। কোনও কথা হয়নি। আলাদা আলাদা করে চেয়ার ছেড়ে দুজন দুজনের মত কোনও উত্তর খুঁজতে বেরিয়ে গেছিল। ছোটো করে "বাই" টাও বলা হয়নি।

             বাড়ি ফিরে মেল লিখতে বসল সিলভাঁকে, গুছিয়ে লিখতে হবে যে এখন যাওয়া সম্ভব না। কোনোদিন  সিলভাঁর সাথে আর দেখা হবে কিনা অনিশ্চিত।

চন্দ্রবিন্দুর একটা লাইন থেকে যায়, "মুখ নীচু আহত দুচোখ বলেছিল কি যে"!      

Sunday, January 22, 2012

বেগুন পোড়া আর ভাত

আমার স্কুল জীবন কেটেছে এক রামকৃষ্ণ মিশনে। আজ যে ঘটনাটি মনে পড়ল আর মনে হল সবাইকে জানাই, সেটি আজ থেকে বহুদিন আগের, আমি তখন ক্লাস সেভেন এ পড়ি। আমাদের ক্লাসরুম ছাত্রদেরই পরিষ্কার রাখতে হত। অর্থাৎ ঝাঁট দিয়ে সাফ রাখার দায়িত্ব ছাত্রদেরই ছিল। ক্লাসর এর কোণ ছাত্র কবে ঝাঁট দেবে, তার একটি তালিকা ক্লাস এর সামনে টাঙ্গানো থাকতো আর সেই কাজ ঠিক মত হচ্ছে কিনা দেখার দায়িত্ব থাকতো ক্লাসেরই একজন ছাত্রের ওপর, তাকে বলা হত "ঝাড়ু কাপ্তেন"। ক্লাসরুম ঝাঁট দেওয়া হত দুইবার- সকালে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আর দুপুরে টিফিনের পর।

সেইবার আমার দায়িত্ব পড়েছিল বুধবার টিফিনের পরে, ক্লাস ঝাঁট দেওয়ার। যা হত, টিফিনের সময় মাঠে খেলে আমি দেরী করে ক্লাস এ ঢুকতাম আর আমার ঝাঁট দেওয়া অধিকাংশ দিনই হত না। আমাদের হেড মাস্টার মহারাজ টিফিনের পর গোটা স্কুল একবার ঘুরে দেখতেন। ক্লাস এর মধ্যে নোংরা দেখলে ছাত্রদের সাবধান করে দিতেন। ঠিক একই ব্যাপার হয় ক্লাস সেভেন- সি , অর্থাৎ আমার সেকশনে। মহারাজ পর পর দুই সপ্তাহ আমাকে সাবধান করে যান, আর শব্দ আমার কানে সরল রেখায় চলে। তৃতীয় বুধবার সেই একই ব্যাপার হওয়ায়, উনি আমাকে ওনার রুম এ ডেকে পাঠান।

আমি গেলাম, হাত পাতলাম, প্রায় তিরিশ খান বেতের বাড়ি দুই হাতে খেলাম, চলে এলাম। হাতের অবস্থা আর বলে দিতে হবে না। মুখ চোখ লাল হোয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু কান্না আসেনি। রাতে চামচ দিয়ে খেয়েছি।


পরের দিন অফিসের গৌতমদা টিফিনের সময় ডেকে বলল মহারাজ আবার ডাকছেন। সেদিন মারলে আর লাগত না। যেতেই মহারাজ ওনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বললেন। বসলাম।  গৌতমদা সামনে একটা প্লেট রেখে গেলো। মহারাজ ওনার যে দুপুরের খাবার এসেছিল, তার থেকে সেই প্লেট এ নিজের হাতে ভাত আর বেগুন পোড়া বেড়ে দিলেন আমাকে আর খাওয়া শুরু করতে বললেন। খেলাম। যেটুকু রাগ মনের মধ্যে জমা হয়েছিল, এক মুহূর্তে চলে গেলো। চোখ অল্প ভিজে এসেছিল। উনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে এক দিন এই বেতের বাড়ি  আর এই বেগুন পোড়ার গুরুত্ব আমি বুঝতে পারব। 


আজ যত বড় বড় রেস্টুরেন্ট এ যতরকম খাবার খাই, তাদের স্বাদ সেই বেগুন পোড়ার থেকে হাজার গুনে ভালো। কিন্তু আজ আমি যতটুকু হতে পেরেছি, সেই বেগুন পোড়া আর ভাত  তার জন্য  অনেকটাই দায়ী।

Thursday, January 12, 2012

“আসি ভাই”


আমার প্রতিটি সুদূরের সময়সাপেক্ষ ট্রেন যাত্রা এক অন্য মাত্রার অভিজ্ঞতা। ভারতীয় রেলের সাথে আমার এমনিতে কোনও শত্রুতা নেই, তবে অবশ্যই সময়ের অভাবে, সময় সময় কিছুটা পকেটের স্বভাবে তাকে নিকটাত্মীয় করে তুলতে পারিনি। খুব ছোটো থেকেই একটি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আমার আছে। প্রকৃতির ডাকে যখন তার পূর্ব অথবা পশ্চিম স্টাইল এর শৌচালয় ব্যবহার না করা ছাড়া আর উপায় থাকে না, তখন সেই অদ্ভুত ঝাঁকুনি স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মে বাধা দিয়ে বড়ই বিব্রত করে। তবু সব বাধা বিপত্তিকে পাশে সরিয়ে রেখে, হাওড়া থেকে আরেকবার চেপেই বসলাম একটি বাতানুকূল কামরায়; গন্তব্য বম্বে, সময়সীমা ছাব্বিশ ঘণ্টা!

     আমার সিটের উল্টোদিকে এক বাঙ্গালী কাকু-কাকিমা। ওনারা বম্বেতে ওনাদের আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছেন। আর আমার ওপরের বার্থে একটি বাঙ্গালী ছেলে, বয়স সাতাশ কি আঠাশ; মুখটি অত্যন্ত গম্ভীর, খুব চিন্তার মধ্যে আছে মনে হল। এবারেও আমার বয়সী কোনও মহিলা সহযাত্রী পেলাম না, সকালে নিশ্চয়ই নিজের মুখ দেখে উঠেছি। ট্রেন ছাড়ল ঠিক সময়ে। আমিও নিজের মত ম্যাগাজিন পড়া, ল্যাপিতে একটু কাজকর্ম করায় নিযুক্ত হলাম। কিছুক্ষণ পরের থেকেই ছেলেটির ফোনে বাক্যালাপ শুরু হল বিভিন্ন লোকজনের সাথে এবং তা চলল পরের দিন বম্বে নামার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত, শুধু রাতের ঘুমানোর সময়টুকু বাদ দিয়ে। তার ফোনে কথপকথন অবশ্যই আমার সব কাজে বিঘ্ন ঘটাতে শুরু করল কিন্তু তাকে কিছু বলতে পারলাম না কারন বিষয়টি অত্যন্ত গম্ভীর। তবে তার সারমর্ম দাঁড়ায় এই -ছেলেটি বম্বেতে কোনও ব্যবসা করে। কিছুদিন আগে বাড়ির লোকদের অমতে  বিয়ে করেছে। এখন মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি আসতে চাইলে মেয়েটির বাড়ি থেকে আপত্তি জানানো হচ্ছে। এই বিষয়ে তারা আইনত কোনও ব্যবস্থাও নিতে চলেছেন।

    কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা ঘামানোর কোনও ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু ছেলেটির এই অবস্থা দেখে আমার নিজের খুব খারাপ লাগল। হয়ত সে কোনও অন্যায় কিছু করেনি কিন্তু নিঃসন্দেহে এখন অত্যন্ত চিন্তার মধ্যে রয়েছে। তার ওপর  কর্মসূত্রে ঠিক এইসময়ই ওকে বম্বে আসতে হচ্ছে। কিন্তু গোটা ট্রেনে আমি আগ বাড়িয়ে এই বিষয় নিয়ে কোনও কথা বললাম না, অন্য কোনও বিষয় নিয়েও তার সাথে আমার কথা হয়নি।

     ট্রেন বম্বেতে ঢুকছে, নামতে যাব, আমার সামনে ছেলেটি দাঁড়িয়ে। ছেলেটির পিঠে আলতো টোকা মেরে ডাকলাম, বললাম, “ভাই আমার নম্বরটা রেখে দাও। যদি উকিলের দরকার হয় আমাকে জানিও। আমি উকিল নই, তবে জানাশোনা ভালো একজন অভিজ্ঞ উকিল আছেন, এইসব বিষয়ে খুব পাকা, নিজে জীবনে বিয়ে করেননি। চিন্তা নেই, সবকিছু ভালই হবে। আসি ভাই।“

     নাম্বারটি দিয়ে নেমে গেলাম, হাঁটতে লাগলাম ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে।

Wednesday, January 11, 2012

মাথার পোকা


অনেক ছোটো জায়গা থেকে উঠে এসেছিল। ছোটো মানে সেখানকার লোকগুলোর মন, তাদের সঙ্কীর্ণ মানসিকতা, কিছু না জেনেই গোটা দুনিয়ার মুহূর্তের বিপ্লব ঘটানোর প্রবণতা, সারাজীবন একই জায়গায় টিকে থাকা, পৃথিবী দেখা বলতে কেবল একটা পাড়া। দোষ তাদের নয়, দোষ সমাজের, দোষ রাজনৈতিক অবশ্যই। সারা দুনিয়ার কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে, কিছু একটা হতে, বিশাল উদারতা প্রকাশ করতে না ওকে ওর চারপাশের মানুষ শিখিয়েছে, না পরিবেশ, না ছোটবেলার স্কুল শিখিয়েছে। কিছুই ছিল না, তবে একটা মন ছিল বাইরের সবকিছুর দিকে যা খুব সহজেই আকৃষ্ট হোতো। আর একজন ছিলেন, ওর মা, সবকিছুই ছেলের জন্য ত্যাগ করেছিলেন। এটা হয়ত বাংলার ঘরে ঘরে আজও অসংখ্য মধ্যবিত্ত ঘরের মা-এরা করে থাকেন। আর হ্যাঁ, মধ্যবিত্ত কখনই একটা শ্রেণী নয়, এটা একটা মানসিকতা। 

     মনে আছে, সত্যজিৎ রায়ের “নায়ক” ছবিতে ট্রেনের ডাইনিং কারে “মিস আধুনিকা” নায়ক অরিন্দমকে বলছিলেন যে বাংলার বাইরে এলে বাইরের চেহারাটা কিরকম বদলে যায়। আমি যখন ট্রেনে এখন ঠিক বাংলা পার হচ্ছি, এই কথাটাই হঠাৎ করে মনে এলো। যাই হোক, যার কথা লিখতে বসেছিলাম, এটাই হয়ত আদর্শ সময় তার সবকিছুকে আমি নিজের মত করে সাজিয়ে লিখি। হালকা জঙ্গল শুরু হোয়ে গেছে। 

      একটা মানুষকে নিয়ে লিখতে বসলে যদি এই মানসিকতা থাকে যে তার সব ভালো দিকগুলোই আমি লিখব, তবে মনে হয় প্রথমে তার খারাপ গুণ গুলো নিঃসঙ্কোচে বলে ফেলা ভালো এই বেলায়। ও প্রচণ্ডভাবে জেদি, যদি ভাবে করব তো করবে, যদি করবে না তো ভগবানেরও সাধ্য নেই; সবসময় নিজের মর্জিতে চলেছে; সময় মেনে চলতে দরকারে সবাইকে ছাড়তে পারে, পান করা বা পান খাওয়া কোনটাতেই আপত্তি নেই, সিগারেটেও; যাদের ভালোবাসে, তাদের জন্য নিজের সর্বস্ব খোয়ায়। উপরোক্ত গুণ গুলোকে বদগুণ বললাম কারন অনেকে না হলে আমাকে বদলোক ভাববেন। আসলে সৎ এবং বদ, এই দুটি গুণ আজ তাদের আপেক্ষিকতার চরম অবস্থান থেকে এতটাই নিকট প্রতিবেশী হোয়ে উঠেছে যে কোনও মানুষকে বশ করার আগে বুঝে উঠতে পারেনা নিজেরা আকর্ষণ করবে না বিকর্ষণ। 

       বিজ্ঞানের ভাষায় জাড্য ধর্মের যা অর্থ, ওর গুণ গুলো অবশ্যই সেই জাড্য ধর্ম মেনে চলে। আর সেখানেই বোধহয় সব মুশকিলের সূচনা। এই জাড্য ধর্মের নাম দিলাম “মাথার পোকা” কারন এই ধর্মই ওর সব আবেদন, প্রতিশ্রুতি, স্বপ্নকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে খেয়েছে। এর জ্বালা চামড়ায় নয়, হৃদয় কোটরে নয়, কিছুটা হয়ত মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থে কারন আজ ওর সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে রাখার ক্ষমতা কমে এসেছে। তবে সময়ে সময়ে এই পোকার আকস্মিক আগমন ওর বাইরের জগতটাকে কাছ থেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। কিন্তু মনের জানলা সবসময় খোলা, আলো বাতাসের অবাধ প্রবেশের জন্য। খোলা রাখতেই হবে, সিধু জ্যাঠা বলেছে তো! 

       ঘাটশীলা পার হলাম।